অর্গানিক ফসলের পোকা দমনে প্রাকৃতিক বন্ধুর খোঁজে: কৃষকের অভিজ্ঞতা ও বিজ্ঞানসম্মত সমাধান | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অর্গানিক ফসলের পোকা দমনে প্রাকৃতিক বন্ধুর খোঁজে: কৃষকের অভিজ্ঞতা ও বিজ্ঞানসম্মত সমাধান

সুমাইয়া পারভীন  avatar   
সুমাইয়া পারভীন
অর্গানিক ফসলের পোকা দমনে প্রাকৃতিক বন্ধুর খোঁজে: কৃষকের অভিজ্ঞতা ও বিজ্ঞানসম্মত সমাধান
অর্গানিক ফসলের পোকা দমনে প্রাকৃতিক বন্ধুর খোঁজে: কৃষকের অভিজ্ঞতা ও বিজ্ঞানসম্মত সমাধান
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত তিন বছরে বাংলাদেশে জৈব পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদনে পোকা দমনের ক্ষেত্রে কৃষকের অ...

সম্প্রতি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত তিন বছরে বাংলাদেশে জৈব পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদনে পোকা দমনের ক্ষেত্রে কৃষকের অংশগ্রহণ প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমানোর একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। বিশেষত, রাজশাহী ও যশোর অঞ্চলের পেঁপে, বেগুন এবং বিভিন্ন সবজি ক্ষেতে ফেরোমন ফাঁদ, আলোর ফাঁদ এবং উপকারী পোকা লেডিবার্ড বিটলের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এই পরিবর্তন শুধু কৃষকদের উৎপাদন পদ্ধতিতেই নয়, মাটির স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক পরিবেশের উপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে। একসময় রাসায়নিক কীটনাশকের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল কৃষকরা এখন প্রাকৃতিক উপাদানের দিকে ঝুঁকছেন, যা একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনছে, তেমনই অন্যদিকে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে সহায়তা করছে। এই প্রবণতা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সুরক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কৃষকদের এই প্রাকৃতিক পদ্ধতির দিকে ঝুঁকে পড়ার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং রাসায়নিক কীটনাশকের বহুমুখী ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, রাসায়নিক কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার মাটির উর্বরতা হ্রাস, উপকারী অণুজীবের বিনাশ এবং কৃষকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, বিআরআরআই কর্তৃক পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ধানে বাদামী গাছ ফড়িং দমনে রাসায়নিক কীটনাশকের পরিবর্তে 'পার্চিং' (ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করা) ও 'আলোর ফাঁদ' ব্যবহার করে প্রায় ২০-৩০% কীটনাশকের খরচ কমানো সম্ভব হয়েছে এবং ফসলের উৎপাদন প্রায় একই রাখা গেছে। এছাড়া, বারি উদ্ভাবিত জৈব বালাইনাশক যেমন ট্রাইকোডার্মা ভিত্তিক ছত্রাকনাশক এবং নিম-ভিত্তিক কীটনাশক ব্যবহার করে কৃষকরা ভালো ফল পাচ্ছেন। বগুড়ার শেরপুরে জৈব পদ্ধতিতে সবজি চাষ করা কৃষক আব্দুর রহিম জানান, তিনি এখন আর রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার করেন না। তিনি বলেন, "আগে পোকা মারতে অনেক টাকা খরচ হতো, এখন নিম তেল আর কিছু দেশি পদ্ধতি ব্যবহার করি। ফসলও ভালো হয়, দামও ভালো পাই।" কৃষকদের এই ধরনের অভিজ্ঞতাগুলোই প্রাকৃতিক পোকা দমন পদ্ধতির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

বিজ্ঞানসম্মত সমাধান এবং গবেষণা এক্ষেত্রে কৃষকদের পথ দেখাচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্পে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে কীভাবে উপকারী পোকা যেমন লেডিবার্ড বিটল, মাকড়সা এবং পরজীবী বোলতাকে কাজে লাগানো যায়। এসব উপকারী পোকা ক্ষতিকারক পোকা খেয়ে ফসলের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। এছাড়া, ফসলের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং পোকার আক্রমণ কমাতে শস্য পর্যায়ক্রম (Crop Rotation), মিশ্র চাষ (Mixed Cropping) এবং উপযুক্ত জাত নির্বাচন (Resistant Variety Selection) এর মতো পদ্ধতিগুলো অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় সম্প্রতি জৈব কৃষি উন্নয়নে একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যার লক্ষ্য হলো কৃষকদের রাসায়নিকমুক্ত কৃষি অনুশীলনে উৎসাহিত করা এবং জৈব পণ্যের বাজার তৈরি করা। এই নীতিমালায় জৈব সারের ব্যবহার, জৈব বালাইনাশকের উৎপাদন ও বিতরণ এবং জৈব কৃষি সনদ প্রদানের বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা থাকবে। এই পদক্ষেপগুলো কৃষকদের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করবে, যেখানে তারা নিরাপদে এবং লাভজনকভাবে প্রাকৃতিক উপায়ে ফসল উৎপাদন করতে পারবে। এর ফলে শুধু কৃষকেরাই নন, সামগ্রিকভাবে দেশের ভোক্তা সমাজও নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করতে পারবে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।

বছর মোট কৃষি জমিতে জৈব পদ্ধতি ব্যবহারকারী কৃষকের সংখ্যা (আনুমানিক) জৈব পদ্ধতিতে পোকা দমনের জন্য ব্যবহৃত প্রধান প্রাকৃতিক পদ্ধতি রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার হ্রাস (%)
২০২০ ১,৫০,০০০ ফেরোমন ফাঁদ, নিম তেল, জৈব সার ১০%
২০২১ ১,৭৫,০০০ আলোর ফাঁদ, উপকারী পোকা (লেডিবার্ড বিটল), শস্য পর্যায়ক্রম ১২%
২০২২ ২,০০,০০০ জৈব বালাইনাশক (ট্রাইকোডার্মা), মিশ্র চাষ, রোগ প্রতিরোধী জাত ১৫%
২০২৩ ২,৩০,০০০ সমন্বিত বালাই দমন (IPM), জৈব কৃষি পদ্ধতি ১৮%

উৎস: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর সম্মিলিত প্রতিবেদন, ২০২৩।

সুপারিশ

  • কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এর তত্ত্বাবধানে প্রতিটি উপজেলায় অন্তত একটি করে 'জৈব কৃষি মডেল ফার্ম' স্থাপন করা হোক, যেখানে কৃষকদের হাতে-কলমে প্রাকৃতিক পোকা দমন পদ্ধতি, জৈব সার উৎপাদন এবং জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার শেখানো হবে। এই মডেল ফার্মগুলো স্থানীয় কৃষকদের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে এবং নতুন প্রযুক্তির প্রসারে সহায়তা করবে।
  • পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) যৌথভাবে একটি 'জৈব পণ্য সার্টিফিকেশন' প্রোটোকল তৈরি ও বাস্তবায়ন করুক, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে। এর মাধ্যমে জৈব কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের মান নিশ্চিত করা যাবে এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা ও মূল্য বৃদ্ধি পাবে।
  • বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) কর্তৃক উদ্ভাবিত রোগ প্রতিরোধী ও প্রতিকূলতা সহনশীল ধানের জাত এবং অন্যান্য ফসলের জাতগুলো দ্রুত কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি সমন্বিত বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক, যেখানে সরকারি ভর্তুকি এবং সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা হবে। এতে কৃষকরা শুরু থেকেই শক্তিশালী ও রোগমুক্ত ফসল উৎপাদনে সক্ষম হবেন, যা পোকা দমনের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সুমাইয়া পারভীন

সুমাইয়া পারভীন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator