নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলা অডিটোরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস হলরুমে গত শনিবার জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় এক অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সভায় স্বাগত বক্তব্য প্রদানের সময় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাসান মোহাম্মদ জুনায়েদ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম উচ্চারণ না করায় উপস্থিত বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের মূল হোতা হিসেবে জিয়াউর রহমানের নাম বাদ পড়ায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। সভার শুরুতেই এই তথ্যগত বিচ্যুতি উপস্থিত নেতাকর্মীদের ক্ষুব্ধ করে তোলে, যার ফলে অনুষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে এবং কয়েকজন নেতাকর্মী সরাসরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান। ঘটনাটি রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার জায়গা থেকে তাৎক্ষণিকভাবে গুরুত্ব পাওয়ায় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
ভুক্তভোগী নেতাকর্মীদের অভিযোগ ছিল, ৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি দিবস মূলত জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদের দর্শনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। অথচ সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা হিসেবে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে তাঁর নাম এড়িয়ে যাওয়া কেবল অসাবধানতা নয়, বরং ইতিহাসের প্রতি অবজ্ঞার শামিল বলে দাবি করেন তারা। পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফরিদুজ্জামান ফরিদ বলেন, ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে জিয়াউর রহমানের অবদান অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই, তাই স্বাগত বক্তব্যে নাম না আসায় নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে বাধ্য হয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি সেলিম কার্নায়েনসহ উপস্থিত নেতারা হস্তক্ষেপ করেন। তারা জানান, বিষয়টি নিয়ে নেতাকর্মীদের মাঝে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তা মূলত দিবসটির তাৎপর্য রক্ষার তাগিদ থেকেই উদ্ভূত হয়েছে। তবে শিক্ষা কর্মকর্তা নিজের ভুল বুঝতে পেরে পুনরায় মঞ্চে ফিরে আসার পর আলোচনার পরিবেশ পুনরায় স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসে।
ঘটনার প্রেক্ষিতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাসান মোহাম্মদ জুনায়েদ জানান, তাঁকে কেবল প্রারম্ভিক স্বাগত বক্তব্য প্রদানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং কোনো লিখিত স্ক্রিপ্ট না থাকায় তাৎক্ষণিক বক্তৃতায় নাম উল্লেখ করা সম্ভব হয়নি। তিনি দাবি করেন, বিষয়টি মোটেও ইচ্ছাকৃত ছিল না এবং কারো প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের কোনো উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না। নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি উপস্থিত সকলের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং পুনরায় বক্তব্যে ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের গুরুত্ব বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা খাতুন ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাফিজুল ইসলাম হারুনের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই সভায় পরবর্তীতে কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই কার্যক্রম সমাপ্ত হয়। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিছক ভুল বোঝাবুঝি হিসেবে চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিষয়ে অধিক সতর্ক থাকার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনাটি সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা ও ঐতিহাসিক তথ্যের সঠিক উপস্থাপনার প্রয়োজনীয়তাকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে। একটি স্থানীয় অডিটোরিয়ামের ছোট এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক দিবসগুলোতে সরকারি ও রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব কতটা জটিল পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। যদিও শিক্ষা কর্মকর্তার তাৎক্ষণিক দুঃখ প্রকাশের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, তবুও ভবিষ্যতে এ ধরনের সরকারি আয়োজনে যথাযথ প্রস্তুতি ও সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বজায় রেখেও ইতিহাসের সত্যকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা যে জনপ্রশাসনের অন্যতম দায়িত্ব, তা এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আরও একবার প্রমাণিত হলো। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও জননিরাপত্তার স্বার্থে ভবিষ্যতে এ জাতীয় অনুষ্ঠানে আরও স্বচ্ছতা ও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে স্থানীয় সচেতন মহল প্রত্যাশা করছে।