সম্প্রতি ইশরাক হোসেনের পিস্তল হাতে মাদক সেবীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং মাদক ব্যবসায়ীদের ধরতে সরাসরি মাঠে নামার ঘটনাটি দেশের রাজনৈতিক ও আইন-শৃঙ্খলা অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। একজন দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তির আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা কেবল তার ব্যক্তিগত আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। যখন দেশে সুনির্দিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থাকা সত্ত্বেও একজন জনপ্রতিনিধিকে অস্ত্র হাতে অভিযানে নামতে হয়, তখন তা প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের প্রচলিত বিচারিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থারই প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। এই ঘটনাটি নির্দেশ করে যে, প্রশাসনিক জটিলতা বা তদারকির অভাবের কারণে ক্ষেত্রবিশেষে জনপ্রতিনিধিরা আইন প্রয়োগের দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছেন, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করছে।
ভুক্তভোগী মহল এবং সাধারণ সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করছেন, ইশরাক হোসেনের এই কর্মকাণ্ড আবেগতাড়িত হলেও এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক। মাদক নির্মূলের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হলেও, একজন সংসদ সদস্য বা প্রতিমন্ত্রী যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা পালন করেন, তখন তা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি ও বিশৃঙ্খলার বার্তা দেয়। ভুক্তভোগীদের মতে, আবেগ নিয়ন্ত্রণের অভাবে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা প্রায়শই এমন সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন যা পরবর্তীতে তাদের দলীয় ভাবমূর্তিকে সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। যদি ইশরাক হোসেনের এই কর্মকাণ্ডকে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে ধরা হয়, তবে দেশের অন্যান্য জনপ্রতিনিধিরাও একইভাবে অস্ত্র হাতে রাজপথে নামার সাহস পাবেন, যা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে এবং মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে চরম বিশৃঙ্খলা ডেকে আনবে।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের মতে, ইশরাক হোসেনের এই পদক্ষেপকে সমর্থন করার কোনো অবকাশ নেই, কারণ রাষ্ট্রের প্রতিটি কাজের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যাখ্যা না আসায় জনমনে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা সরকারের দায়িত্ব, কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি আইন হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি বৈধতা পায়, তবে রাষ্ট্র অচিরেই মব জাস্টিস বা গণপিটুনির মতো পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হবে। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা বা দীর্ঘসূত্রতা যদি একজন প্রতিমন্ত্রীকে অস্ত্র হাতে তুলে নিতে বাধ্য করে থাকে, তবে সেই প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সরকারকে অবিলম্বে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে এবং জনপ্রতিনিধিদের সাংবিধানিক সীমানা সম্পর্কে পুনরায় সচেতন করতে হবে।
পরিশেষে, ইশরাক হোসেনের এই বিতর্কিত ভূমিকা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও দেশের ভাবমূর্তিকে সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে। বিশ্ব দরবারে একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের যে ভাবমূর্তি, তা জনপ্রতিনিধিদের এমন হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষুণ্ণ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে প্রশাসনের ওপর আস্থার জায়গাটি পুনর্নির্মাণ করা এখন জরুরি। কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে মাদকবিরোধী অভিযান নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই মাদক নির্মূল করা সম্ভব। অদূর ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে চরম হুমকির মুখে ফেলতে পারে, যা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।