ঝুপড়িতে মানবেতর দিন কাটছে বৃদ্ধ ও শিশুদের, শীতে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা
মেহেদী হাছান, ফরিদগঞ্জ:
ঘরে বাঁশের বেড়া, চালে বাঁশের চাটাই। তার ওপর পলিথিন মোড়ানো এক চিলতে ঝুপড়ি ঘরই এখন তীব্র শীত, বৃষ্টি কিংবা প্রখর রোদে একটি পরিবারের একমাত্র ভরসা। দিনের বেলা যে চালের ফাঁক গলে সূর্যের আলো আসে, রাতে দেখা মেলে চাঁদের—তবে তা কোনো সৌখিনতা বা সুখানুভূতির নয়। নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি রক্ষা ও আইনি জটিলতায় বাধ্য হয়ে এমনই এক অমানবিক পরিস্থিতিতে জীবনযাপন করছেন এক পরিবারের সদস্যরা।
চাঞ্চল্যকর ও হৃদয়বিদারক এ ঘটনাটি ঘটেছে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের চরমান্দারী গ্রামের বশির উল্লাহ ভূঁইয়া বাড়িতে। আসন্ন শীতের আগেই যদি তারা পাকা ঘরে উঠতে না পারেন, তবে ওই পরিবারের বৃদ্ধ ও শিশুরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞ আদালত, থানা পুলিশ ও সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই বাড়ির বয়োবৃদ্ধ ফয়েজ আহমেদ যৌবনে দিনমজুরির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। চরম দারিদ্র্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কষ্টার্জিত সঞ্চয় দিয়ে ছেলে মনির হোসেনকে কাজ শিখিয়ে সৌদি আরবে পাঠান। প্রবাস থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে নিজের ভিটাতে একটি পাকা ঘর নির্মাণের স্বপ্ন দেখেন ফয়েজ আহমেদ। প্রায় দীর্ঘ ছয় মাসের পরিশ্রমে মাটির নিচ থেকে ঘরটির ছাদ ঢালাইয়ের কাজও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছালে স্থানীয় একটি চাঁদাবাজ চক্রের কুদৃষ্টি পড়ে ফয়েজ আহমেদের ভবনের ওপর। চাঁদাবাজির কৌশল হিসেবে তারা ফয়েজ আহমেদের স্বজন মৃত শাহজাহানের পরিবারকে উসকে দিয়ে বিরোধের সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে প্রতিপক্ষরা নির্মাণকাজে বাধা দেয় এবং ফয়েজ আহমেদের পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা ও মারধর চালায়। ঘটনার পর বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরে প্রতিকার না পেয়ে ফয়েজ আহমেদের ছোট ভাই মো. তাজুল ইসলাম বাদী হয়ে বিজ্ঞ আদালতের দ্বারস্থ হন। আদালত মামলাটি গ্রহণ করার পর থেকেই ঘরটির নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে এবং বাধ্য হয়ে ঝুপড়ি ঘরে আশ্রয় নিতে হয়েছে পরিবারটিকে।
ক্ষতিগ্রস্ত ফয়েজ আহমেদ ও তার ভাই মো. তাজুল ইসলাম বলেন, “আমাদের প্রতিপক্ষ মৃত শাহজাহানের স্ত্রী ও সন্তানরা মূলত আমাদেরই নিকটাত্মীয়। তাদের সঙ্গে আমাদের জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধ থাকলেও যে স্থানে বিল্ডিং করা হচ্ছে, সেখানে কোনো বিরোধ ছিল না। গত ছয় মাস আমরা নির্বিঘ্নেই কাজ করেছি। কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী চক্রের প্ররোচনায় এখন আমাদের কাজে বাধা ও মারধর করা হচ্ছে। আদালত নোটিশ দেওয়ার পর প্রতিপক্ষরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের নারী ও প্রবীণ সদস্যদের মারধর করেছে। সামনে তীব্র শীত; এই ঝুপড়ি ঘরে ছোট ছোট শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”
বিবাদী পক্ষের বক্তব্য জানতে চাইলে মৃত শাহজাহানের ছেলে মো. হারুনুর রশিদ সম্পত্তিগত বিরোধের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “ফয়েজ আহমেদ গংদের সাথে আমাদের জমি নিয়ে আগে থেকেই বিরোধ রয়েছে। ঘর নির্মাণের আগে সেই বিরোধের ফয়সালা হতে হবে।”
এদিকে সচেতন মহলের অভিমত, স্থানীয় একটি বিশেষ চক্র দুই পক্ষের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বকে পুঁজি করে নিজেদের আর্থিক সুবিধা হাসিলের চেষ্টা করছে। তারা নিরসন না করে আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করছে। শীতের প্রকোপ বাড়ার আগেই মানবিক কারণে বিষয়টি সমাধানের তাগিদ দেন তারা।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে ফরিদগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবু তাহের বলেন, “এই যুগে এসেও একটি পরিবারকে ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করতে হচ্ছে—বিষয়টি সত্যিই দুঃখজনক। আদালতের নোটিশ জারিকে কেন্দ্র করে বাদী পক্ষ মারধরের শিকার হয়েছে মর্মে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। আমরা স্থানীয়ভাবে সমঝোতার চেষ্টা করলেও বিবাদী পক্ষের অসহযোগিতার কারণে তা সম্ভব হয়নি।”
এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ এরশাদ উল্লাহ জানান, “আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বিবাদী পক্ষকে নোটিশ জারি করা হয়েছে। পরবর্তীতে মারধরের একটি লিখিত অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
পরিবারটির শারীরিক ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান জুয়েল বলেন, “চরমান্দারী গ্রামে ঝুপড়ি ঘরে একটি পরিবারের অমানবিক বসবাসের বিষয়টি আমার গোচরীভূত হয়েছে। মামলা সংক্রান্ত কারণে আবাসন বিষয়ে আমাদের আইনি কিছু করার না থাকলেও, স্বাস্থ্যগত দিক থেকে বিষয়টি উদ্বেগজনক। সামনে শীত আসছে; এভাবে খোলা ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করলে প্রবীণ ও শিশুরা নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন শীতকালীন জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে।”