বাগেরহাটের মোংলায় অসহায়, ছিন্নমূল ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কল্যাণে পরিচালিত ‘এক বেলার মেহমানখানা’য় আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে সামাজিক ও মানবিকতার নতুন বার্তা দিলেন পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম। গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর তিনি এই মানবিক উদ্যোগটিতে অংশগ্রহণ করেন এবং কোনো প্রকার প্রটোকল বা আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই সাধারণ মানুষের সঙ্গে মাটিতে বসে দুপুরের খাবার গ্রহণ করেন। সরকারের উচ্চপর্যায়ের একজন প্রতিনিধির এমন সাধারণ জীবনবোধ এবং প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার ঘটনাটি স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মূলত মোংলা পোর্ট পৌরসভা ও এর আশপাশের এলাকায় ভিক্ষুক ও ভাসমান মানুষের অন্ন সংস্থানের লক্ষ্যেই এই ‘এক বেলার মেহমানখানা’র কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে, যা স্থানীয় যুবকদের একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল। প্রতিমন্ত্রীর এই উপস্থিতি কেবল মানবিক সংহতিই প্রকাশ করেনি, বরং তৃণমূল পর্যায়ের জনকল্যাণমূলক কাজের প্রতি সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটিয়েছে। এসময় তার সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারাও একইভাবে মাটিতে বসে খাবার গ্রহণ করেন, যা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধের চর্চাকে উৎসাহিত করেছে।
দীর্ঘ এক বছর ধরে চলা এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগটি স্থানীয় পর্যায়ে অভাবী মানুষের জন্য একটি আস্থার ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। আয়োজক তরুণদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত অনুদান, স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং বন্ধুদের সহায়তায় প্রতি শুক্রবার এই খাবারের আয়োজন করা হয়। ছিন্নমূল মানুষেরা যারা নিয়মিত দুই বেলা অন্ন জোগাতে হিমশিম খান, তাদের জন্য এই আয়োজনটি শুধু এক বেলার খাবার নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তার একটি ছোট পরিসর তৈরি করেছে। ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সুবিধাভোগীদের মতে, অনেক সময় সমাজের বিত্তবানরা দয়া প্রদর্শন করলেও সরাসরি তাদের পাশে বসে খাবার গ্রহণের নজির খুব কমই দেখা যায়। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিমন্ত্রী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এই অংশগ্রহণ তাদের সামাজিক মর্যাদা ও আত্মসম্মানবোধকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আয়োজকদের দাবি, নিয়মিত অর্থায়ন ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গেলে এই কার্যক্রমের পরিধি আরও বাড়ানো সম্ভব, যা মোংলার ভাসমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকা রাখতে পারে।
এই মানবিক কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করে পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, দুস্থ ও অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং তাদের পাশে দাঁড়ানো সমাজের প্রতিটি সামর্থ্যবান মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। তিনি আয়োজক যুবকদের কঠোর পরিশ্রম ও মানবিক দূরদর্শিতার প্রশংসা করে সরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে এই ধরনের কাজে আরও বেশি সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, যাদের মধ্যে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবু হোসেন পনিসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন, তারাও এই উদ্যোগকে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে একটি সামাজিক বিপ্লব হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জনকল্যাণমূলক এমন উদ্যোগের প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে এবং ভবিষ্যতে এই ধরণের মানবিক কর্মকাণ্ডকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। কর্তৃপক্ষের এই ইতিবাচক মনোভাব আয়োজকদের আরও বড় পরিসরে কাজ করার সাহস জোগাচ্ছে।
পরিবহন ও সামাজিক অস্থিরতার এই সময়ে মোংলার ‘এক বেলার মেহমানখানা’র মতো উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে যে, কেবল সরকারি অনুদান নয়, বরং তরুণ প্রজন্মের সঠিক নেতৃত্ব ও সামাজিক সচেতনতাই পারে একটি মানবিক সমাজ বিনির্মাণ করতে। প্রতিমন্ত্রীর এই সরাসরি অংশগ্রহণ সাধারণ মানুষের মনে সরকারি সেবার প্রতি আস্থার জায়গাটিকে আরও সুদৃঢ় করেছে। একই সঙ্গে, এটি অন্যান্য অঞ্চলের তরুণদের জন্যও একটি রোল মডেল হিসেবে কাজ করবে, যা ভবিষ্যতে দেশের প্রতিটি জেলায় অসহায় মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার বলয় তৈরিতে অনুপ্রাণিত করবে। সামাজিক সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধের এই চর্চা অব্যাহত থাকলে প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এটি একটি টেকসই মডেল হিসেবে বিবেচিত হবে বলে স্থানীয় সুশীল সমাজ মনে করছে।