বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার দোনা স্কুলের সামনে গত শনিবার সন্ধ্যায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সন্ধ্যা নাগাদ দুটি দ্রুতগামী মোটরসাইকেলের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষের তীব্রতায় রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী একটি টমটম নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের খাদে উল্টে যায়। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং আরও অন্তত ছয়জন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আহতদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় চিকিৎসকরা তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বিশেষ নজরদারিতে রেখেছেন। দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। মূলত মোটরসাইকেলের উচ্চগতি এবং চালকদের বেপরোয়া মনোভাবই এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, যা স্থানীয় জনপদকে শোকস্তব্ধ করে তুলেছে।
দুর্ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, মোরেলগঞ্জের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে কোনো ধরনের ট্রাফিক আইন না মেনেই অদক্ষ চালকরা মোটরসাইকেল ও টমটম চালাচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, ঘটনার সময় মোটরসাইকেল দুটির গতিসীমা এতটাই বেশি ছিল যে, সংঘর্ষের পর টমটমটি সামলানোর কোনো সুযোগই ছিল না চালকের। স্থানীয় এক বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, প্রতিনিয়ত নিয়ম ভেঙে হাইস্পিডে মোটরসাইকেল চালানো এখন এলাকার নিয়মে পরিণত হয়েছে, যার বলি হতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের। আহতদের উদ্ধার করে মোরেলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর সেখানে চিকিৎসা সেবা নিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, কারণ হঠাৎ করে এত বিপুল সংখ্যক আহত রোগীর চাপ সামলানোর মতো পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জামের অভাব সেখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, সড়কগুলোতে নিয়মিত নজরদারি এবং চালকদের লাইসেন্স যাচাইয়ের কঠোর প্রক্রিয়া না থাকায় প্রতিনিয়ত এমন প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
এদিকে ঘটনার প্রেক্ষিতে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, দুই মোটরসাইকেল চালকের কারোই যথাযথ ট্রাফিক সচেতনতা ছিল না এবং বেপরোয়াভাবে ওভারটেক করার সময় তারা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এবং ট্রাফিক পুলিশের অনুপস্থিতিকে এই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। মোরেলগঞ্জ থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনার সাথে জড়িত মোটরসাইকেলগুলো জব্দ করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে একটি আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে স্থানীয় বাস মালিক সমিতি ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বা দায়বদ্ধতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দোষী চালকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সাধারণ মানুষ মনে করছেন, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না করলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি স্থানীয় পরিবহন খাতের চরম বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার অভাবকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। যেভাবে ছোট ছোট যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই অনুপাতে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও ট্রাফিক আইন প্রয়োগ না করায় প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াতের শিকার হচ্ছেন। বাগেরহাটের এই ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং ক্রমবর্ধমান সড়ক নৈরাজ্যের একটি অশনি সংকেত। যদি এখনই মোটরসাইকেল ও টমটম চালকদের ওপর কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানির ঘটনা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যাতায়াত ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় প্রশাসনের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং কঠোর নজরদারিই এখন সময়ের দাবি, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন নির্মমতার মুখোমুখি হতে না হয়।