চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মোহাম্মদপুর গলাচিপা এলাকায় গত শুক্রবার বিকেলে মোহাম্মদ আবু তায়েব প্রকাশ মাইকেল নামে এক ব্যক্তির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে রাঙ্গুনিয়া মডেল থানা পুলিশ। স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাগানের একটি গাছ থেকে ওই ব্যক্তির মরদেহ নামিয়ে আনে। পেশায় দিনমজুর আবু তায়েব স্থানীয় মৃত মফতুল হোসেন ও ছকিনা বেগমের সন্তান ছিলেন। ঘটনার দিন বিকেলে বাড়ির পাশের বাগানে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখে স্থানীয়রা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে খবর দিলে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে। প্রাথমিকভাবে মৃত্যুর কারণ স্পষ্ট না হলেও পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রমতে, পারিবারিক কলহ এবং আর্থিক সংকটের জের ধরে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করতে পুলিশ ঘটনার পারিপার্শ্বিক অবস্থা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরেই আবু তায়েব তার স্ত্রীর কাছে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে আলাপ করছিলেন এবং এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। এই দাম্পত্য বিবাদই কি তার আত্মহত্যার কারণ, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গভীর সংকট রয়েছে—তা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। নিহতের স্বজনরা ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে পড়েছেন এবং তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয়রা বলছেন, একজন কর্মঠ মানুষ হঠাৎ কেন এমন চরম পথ বেছে নেবেন, তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। বিশেষ করে আর্থিক টানাপোড়েন বা পারিবারিক কলহের বাইরেও কোনো তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন বা অন্য কোনো অশুভ ঘটনার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি করছেন অনেকে। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
এ বিষয়ে রাঙ্গুনিয়া মডেল থানার উপপরিদর্শক শহীদুল বিশ্বাস ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জহির উদ্দীন জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রাথমিক আলামত সংগ্রহ করেছে এবং মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত এটি হত্যা না কি আত্মহত্যা, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা এটি আত্মহত্যার ঘটনা হতে পারে, তবে তদন্তের স্বার্থে কোনো কিছুই উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সচেতন মহল মনে করছেন, পুলিশি তদন্তের পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দ্রুত রহস্য উন্মোচন করা প্রয়োজন, যাতে কোনো ধরনের অপরাধী পার পেয়ে না যায় এবং ঘটনার প্রকৃত সত্য জনসমক্ষে উঠে আসে। প্রশাসন এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে বলে আশ্বাস দিয়েছে।
রাঙ্গুনিয়া এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক আত্মহত্যার ঘটনা জনমনে এক ধরনের আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। গত কয়েক মাসে একাধিক আত্মহত্যার ঘটনা এলাকাটিকে মানসিক অস্থিরতার এক ঝুঁকিপূর্ণ জনপদ হিসেবে চিহ্নিত করছে, যা জনমনে প্রশ্ন তুলছে সামাজিক অবক্ষয় ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব নিয়ে। আবু তায়েবের মৃত্যু সেই উদ্বেগজনক তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ ধরনের অকাল মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নই ধ্বংস করে না, বরং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। স্থানীয় সমাজ সচেতন ব্যক্তিরা মনে করছেন, কেবল পুলিশের তদন্ত নয়, বরং এসব ঘটনার নেপথ্যে থাকা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো বিশ্লেষণ করে প্রতিকারের ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। তাই প্রকৃত সত্য উদঘাটনের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং এলাকায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার কোনো বিকল্প নেই।