সাম্প্রতিক ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ ভিশন ২০৪১’ সংক্রান্ত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত তিন বছরে বাংলাদেশের ইডটেক প্ল্যাটফর্মগুলিতে দক্ষতা উন্নয়ন কোর্সের নিবন্ধন প্রায় ১৫০% বৃদ্ধি পেলেও, সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বাস্তব কর্মসংস্থানের হার তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে আছে। বিশেষ করে, ডেটা অ্যানালিটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং সাইবার নিরাপত্তা-এর মতো উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন ক্ষেত্রগুলিতে সনদের প্রাপ্যতা বাড়লেও, শিল্প-সংশ্লিষ্ট দক্ষতা এবং কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্যতার অভাব প্রকট। এই পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে: আমাদের ইডটেক প্ল্যাটফর্মগুলি কি কেবল কাগজের সনদ বিতরণ করছে, নাকি তারা দেশের তরুণ প্রজন্মকে বাস্তব কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত করতে সক্ষম হচ্ছে?
কোভিড-১৯ মহামারীর পর থেকে অনলাইন শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন কোর্সের চাহিদা অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অসংখ্য ইডটেক প্ল্যাটফর্ম গজিয়ে উঠেছে, যারা দ্রুত এবং সহজে দক্ষতা অর্জনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কিন্তু এই দ্রুত প্রসারের সাথে গুণগত মান এবং প্রাসঙ্গিকতার প্রশ্নটি উপেক্ষিত থাকছে। অনেক সময় দেখা যায়, কোর্স কারিকুলাম দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সাথে তাল মেলাতে পারছে না, বিশেষত যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন দক্ষতা দাবি করছে। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা একটি সনদ নিয়ে বের হলেও, শিল্পে তাদের কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা এবং নিয়োগযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের আইটি ও আইটিইএস (ITeS) খাতে প্রায় ৭০% নিয়োগকর্তা মনে করেন যে নতুন স্নাতকদের বাস্তব কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা যথেষ্ট নয়, এমনকি তাদের কাছে ডিজিটাল দক্ষতার সনদ থাকলেও। এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, প্রচলিত ইডটেক মডেল এবং শিল্পের চাহিদা পূরণের মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
এই ব্যবধান পূরণে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রাম ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করলেও, ইডটেক প্ল্যাটফর্মগুলির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও মান নিয়ন্ত্রণের একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো এখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) যেখানে ডিজিটাল সংযোগের অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করছে, সেখানে সেই সংযোগের মাধ্যমে প্রদত্ত শিক্ষার মানের উপর সরাসরি কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আবার, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) দেশের বিভিন্ন হাই-টেক পার্কে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ করে দিলেও, তাদের সাথে ইডটেক প্ল্যাটফর্মগুলির সরাসরি এবং কার্যকর সমন্বয় এখনও সীমিত। এর ফলে, এক দিকে শিক্ষার্থীরা অসম্পূর্ণ দক্ষতা নিয়ে বাজার প্রবেশ করছে, অন্য দিকে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ কর্মী খুঁজে পাচ্ছে না। একটি সমন্বিত এবং মানসম্মত ইডটেক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার জন্য সরকারি সংস্থা, শিল্প এবং ইডটেক প্রদানকারীদের মধ্যে নিবিড় সহযোগিতা অপরিহার্য, যেখানে প্রশিক্ষণের পর কর্মসংস্থানের একটি সুস্পষ্ট পথ থাকবে।
এই সংকট নিরসনে একটি কার্যকর সমাধান হলো ইডটেক কোর্সগুলিকে আরও বেশি ব্যবহারিক ও শিল্প-কেন্দ্রিক করা। অনেক কোর্সই কেবল তত্ত্বীয় জ্ঞান প্রদান করে, কিন্তু হাতে-কলমে প্রকল্প তৈরি, কেস স্টাডি বিশ্লেষণ এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান করার সুযোগ সীমিত থাকে। আধুনিক প্রযুক্তি যেমন এআই-এর ব্যবহার কেবল কোর্সওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত করলেই হবে না, বরং এআই চালিত টুলস ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল এবং ব্যক্তিগতকৃত করতে হবে। এর পাশাপাশি, সফট স্কিলস যেমন যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজ এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার উপর জোর দেওয়া উচিত, যা বর্তমান কর্মক্ষেত্রে অত্যাবশ্যক। ইডটেক প্ল্যাটফর্মগুলিকে নিয়মিতভাবে শিল্পের চাহিদা বিশ্লেষণ করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী তাদের কারিকুলাম আপডেট করতে হবে। এই মুহূর্তে, দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির যুগে, একটি 'ওয়ান-সাইজ-ফিটস-অল' পদ্ধতির পরিবর্তে, কাস্টমাইজড এবং অ্যাডাপ্টিভ লার্নিং পাথওয়ে তৈরি করা জরুরি, যা শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং শিল্পের নির্দিষ্ট প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে পারবে।
| সূচক | ২০২০ সাল | ২০২৩ সাল | পরিবর্তন (%) |
|---|---|---|---|
| ইডটেক প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা (লক্ষ) | ১০.৫ | ২৬.৮ | +১৫৫.২% |
| আইসিটি দক্ষতা উন্নয়ন কোর্সের সংখ্যা (আনুমানিক) | ৮৫০ | ২০০০+ | +১৩৫.৩% |
| ইডটেক কোর্স সম্পন্নকারীদের কর্মসংস্থান হার (৬ মাসের মধ্যে) | ৪০% | ৩৮% | -২% |
| শিল্পে এআই/ডেটা সায়েন্স দক্ষ কর্মীর অভাব (BASIS সমীক্ষা) | ৩০% | ৫০% | +৬৬.৭% |
| জাতীয় গড় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা (কোটি) | ৯.৯ | ১৩.১ | +৩২.৩% |
উৎস: ICT Division, BASIS ও BTRC-এর যৌথ সমীক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন (২০২৩)।
সুপারিশ
- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) অবিলম্বে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এর সাথে যৌথভাবে ইডটেক প্ল্যাটফর্মগুলির জন্য একটি বাধ্যতামূলক জাতীয় মানদণ্ড ও স্বীকৃতি কাঠামো (National Accreditation Framework) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে, যেখানে কোর্স কারিকুলামের প্রাসঙ্গিকতা, প্রশিক্ষকদের যোগ্যতা, ব্যবহারিক প্রকল্প এবং কর্মসংস্থান সহায়তার উপর সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা থাকবে। এই কাঠামো BHTPA এর দক্ষতা উন্নয়ন প্রোগ্রামের মানদণ্ড অনুসরণ করতে পারে।
- বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) তার ইউনিভার্সাল সার্ভিস অবলিগেশন ফান্ড (USOF) ব্যবহার করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সুলভ মূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করার জন্য একটি সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করবে, যাতে দেশের সকল স্তরের শিক্ষার্থীরা মানসম্মত অনলাইন শিক্ষায় সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে।
- অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রাম, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) এর আওতাধীন হাই-টেক পার্কগুলিতে অবস্থিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলির সাথে অংশীদারিত্বে একটি 'জাতীয় ইডটেক অ্যাপ্রেন্টিসশিপ প্রোগ্রাম' চালু করবে। এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে ইডটেক কোর্স সম্পন্নকারীদের জন্য বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা এবং সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, যা শিল্প-শিক্ষার ব্যবধান দূর করতে সহায়ক হবে।