তদবির বাণিজ্য: তিন সরকার, একই পুরনো খেলা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

তদবির বাণিজ্য: তিন সরকার, একই পুরনো খেলা

শরিফুল খান প্লাবন avatar   
শরিফুল খান প্লাবন
তদবির বাণিজ্য: তিন সরকার, একই পুরনো খেলা
তদবির বাণিজ্য: তিন সরকার, একই পুরনো খেলা
ছবি: সংগৃহীত

আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তীকালীন ও বর্তমান বিএনপি সরকার—তিন আমলেই ডিসি-ইউএনও পদায়নে রাজনৈতিক প্রভাব ও তদবিরের অভিযোগ কতটা বদলেছে, ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে এই লেখায়।..

ক্ষমতা তিনবার হাত বদল হয়েছে গত দুই বছরে — আওয়ামী লীগ থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, এরপর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকার। প্রতিবারই প্রতিশ্রুতি ছিল, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদে তদবির ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে। তিন আমলের ঘটনাপ্রবাহ পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে।


আওয়ামী লীগ আমল: আমলাতন্ত্রের দাপট প্রকাশ্যে 

 আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকেও এই সমস্যা এতটাই প্রকট ছিল যে, খোদ ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরাই ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য দবিরুল ইসলাম বলেছিলেন, স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিরা নামমাত্র নির্বাচিত, প্রকৃত ক্ষমতার মালিক আসলে সরকারি কর্মকর্তারাই—এমনকি নিজ দলের এমপিরাও এলাকায় কর্মকর্তাদের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন (প্রথম আলো, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩)। এই মন্তব্য প্রমাণ করে, মাঠ প্রশাসনে আমলাতান্ত্রিক-রাজনৈতিক আঁতাত এবং জবাবদিহিহীনতা আওয়ামী লীগ আমলেই গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছিল।


অন্তর্বর্তীকালীন সরকার: বিশৃঙ্খল রদবদল ও তদবিরের ভিড় 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এর পরপরই মাত্র দুই দিনে ৫৯টি জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ দেওয়া হয়—৯ সেপ্টেম্বর ২৫ জেলায়, পরদিন আরও ৩৪ জেলায় (প্রথম আলো ও বিডিনিউজ২৪, ৯-১০ সেপ্টেম্বর ২০২৪)। কিন্তু এই তড়িঘড়ি নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েই বিতর্ক শুরু হয়—নিয়োগের দুই-একদিনের মধ্যেই আরও প্রায় ৩৯ জন ডিসিকে প্রত্যাহারের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল বলে জানা যায় (দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৪)। এক মাসের মাথায় প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উঠে আসে, কর্মকর্তারা তখনো পদোন্নতি ও ডিসি হওয়ার জন্য তদবিরে ব্যস্ত এবং প্রায় প্রতিদিনই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সামনে তদবিরকারীদের ভিড় লেগে থাকছে (প্রথম আলো, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৪)। পরবর্তীতে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নতুন পদায়ন নীতিমালা জারি করে পুরোনো ১৯৯৭ ও ২০১৫ সালের নীতিমালা বাতিল করা হয় (জাগো নিউজ২৪, ৫ নভেম্বর ২০২৫), এবং আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ১৬৬টি উপজেলায় একযোগে নতুন ইউএনও পদায়ন করা হয় (রাইজিংবিডি, ২৬ নভেম্বর ২০২৫)।



বিএনপি সরকার: পুরনো মুখ সরানো, তবু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারও একই পথে হাঁটে। নির্বাচনের অব্যবহিত পরই ১ মার্চ পাঁচ জেলার ডিসি প্রত্যাহার করা হয় (দেশ টিভি, ১ মার্চ ২০২৬), এরপর ২৯ মার্চ আরও ১১ জেলার ডিসি সরানো হয় (যুগান্তর, ২৯ মার্চ ২০২৬)—এক মাসে মোট ২০ জন ডিসি বদল হয় বলে প্রথম আলো নিশ্চিত করে (প্রথম আলো, ১ এপ্রিল ২০২৬)।


তবে এই রদবদলের রাজনৈতিক মাত্রা প্রকাশ্যে আসে কুষ্টিয়ায়। স্থানীয় এক বিএনপি নেতা প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে দাবি করেন, আগের ডিসিকে তিনি নিজেই ইচ্ছাকৃতভাবে বদলি করিয়েছেন, কারণ সরকার তাদের দলের (বাংলা ট্রিবিউন, ২৭ মার্চ ২০২৬)। প্রায় একই সময়ে খোদ বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী মন্তব্য করেন, ভোট চুরির উদ্দেশ্যেই অতীতে নির্বাচনের আগে ডিসি-ইউএনও-পুলিশে বদলি করা হয়েছিল (দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ২৪ এপ্রিল ২০২৬)—যা প্রমাণ করে, প্রশাসনিক পদায়নের রাজনীতিকরণ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলও সচেতন।
ইতিবাচক দিক হলো, জুলাই মাসে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা ৩২ জন সাবেক ডিসিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয় (ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা, ২৮ জুলাই ২০২৬)—অতীতের দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের একটি পদক্ষেপ। তবে আগস্টে আবার প্রশ্ন ওঠে, যখন লালপুর-বাগাতিপাড়ায় ইউএনও কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার পরদিনই নাটোরের ডিসি প্রত্যাহার ও ইউএনও বদলি করা হয় (ঢাকা পোস্ট, চ্যানেল২৪ ও প্রথম আলো, ১৯ আগস্ট ২০২৬)।


তিন আমলের সাধারণ সুর


তিনটি সরকারের ধরন আলাদা—নির্বাচিত, অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন এবং নতুন নির্বাচিত সরকার—কিন্তু প্রশাসনিক পদায়ন নিয়ে প্রবণতা প্রায় অভিন্ন: (১) ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গেই ডিসি-ইউএনও পর্যায়ে ঢালাও রদবদল, (২) নির্বাচনের আগে-পরে একযোগে শত শত কর্মকর্তা বদলি, (৩) স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবের অভিযোগ বা স্বীকারোক্তি, এবং (৪) মাঝেমধ্যে জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ, তবে তা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপ নেয়নি। ঢাকা জেলা প্রশাসনের লটারি পদ্ধতি (যুগান্তর, ২২ জুলাই ২০২৬) প্রমাণ করে বিকল্প সম্ভব, কিন্তু তা এখনো ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়।


প্রশাসন কি সত্যিই বদলেছে?


তিন আমলের তুলনামূলক চিত্র থেকে সৎ উত্তর হলো—পুরোপুরি না। প্রতিটি সরকারই ক্ষমতায় এসে পূর্বসূরির নিয়োগকৃত কর্মকর্তাদের সরিয়ে নিজস্ব বিশ্বস্ত বলয় বসিয়েছে, আর প্রতিবারই তদবির-বাণিজ্যের অভিযোগ ফিরে এসেছে নতুন মোড়কে। প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন এমন একটি স্বাধীন, নিয়মভিত্তিক পদায়ন ব্যবস্থা, যা সরকার বদলের সঙ্গে বদলায় না—নয়তো "প্রশাসন কি বদলেছে?" প্রশ্নটি প্রতিটি ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন করে উঠতেই থাকবে।


শরিফুল খান প্লাবন 
লেখক ও সাংবাদিক 

 

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator