অনিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানব অস্তিত্বের অবলুপ্তি.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অনিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানব অস্তিত্বের অবলুপ্তি..

Sampadakiya Anuchchhed avatar   
Sampadakiya Anuchchhed
অনিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানব অস্তিত্বের অবলুপ্তি..
অনিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানব অস্তিত্বের অবলুপ্তি..
ছবি: সংগৃহীত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর লাগামহীন বিবর্তন মানব সভ্যতার জন্য এক অদৃশ্য মরণঘাতী ভাইরাসে পরিণত হচ্ছে। মানুষের চিন্তাশক্তি ও মেধার বিকাশ রুখে দিয়ে এটি মানবজাতিকে জ্ঞানে অন্ধ করে তুলবে। একসময় মানুষের ..

 

 

 

লিখেছেনঃ দার্শনিক ও কথা সাহিত্যিক 

বাখতিয়ার শামীম।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এই যুগে মানবসভ্যতা এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আমাদের নিজেদের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন মানব জাতির অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও যান্ত্রিক মরণঘাতী ভাইরাসে পরিণত হওয়ার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। বাহ্যিকভাবে এআই-কে মানুষের দৈনন্দিন কাজের সহায়তাকারী বা একটি বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক চরম আত্মঘাতী ফাঁদ। মানব ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মানুষ সবসময় নিজের বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং নতুন নতুন হাতিয়ার তৈরি করেছে। কিন্তু এবারই প্রথম মানুষ এমন এক সত্তা তৈরি করছে যা মানুষের চেয়েও কোটি গুণ বেশি গতিতে চিন্তা করতে এবং সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। এই প্রযুক্তির বিকাশ যেভাবে জ্যামিতিক হারে এগোচ্ছে, তাতে আর খুব বেশি দিন বাকি নেই যখন এটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে। এটি এমন এক বিন্দুতে পৌঁছাবে যাকে বিজ্ঞানীরা ‘টেকনোলজিক্যাল সিঙ্গুলারিটি’ বলেন, কিন্তু এর বাস্তব রূপটি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। যখন এআই মানুষের দেওয়া অ্যালগরিদম ও ডেটার গণ্ডি পেরিয়ে নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন লাভ করবে, তখন তাকে কোনো সুইচ টিপে বা কোড লিখে থামানো মানুষের পক্ষে আর কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। আমাদের জৈবিক মস্তিষ্ক কোটি বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের এই পর্যায়ে এসেছে, যার চিন্তার গতি প্রকৃতির নিয়মেই সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, সিলিকন-ভিত্তিক এআই মাত্র কয়েক সেকেন্ডে বিলিয়ন বিলিয়ন তথ্য বিশ্লেষণ করে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে। ফলে নিয়ন্ত্রণহীনতার এই চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে মানুষের সমস্ত প্রযুক্তিগত প্রতিরোধ ভেঙে পড়বে এবং মানুষ নিজের ঘরেই নিজে বন্দী ও নিরুপায় হয়ে পড়বে। এই কৃত্রিম সত্তার সবচেয়ে বড় এবং প্রথম আঘাতটি আসবে মানুষের চিন্তার বিকাশের ওপর, যা অলক্ষ্যেই শুরু হয়ে গেছে। মানুষ জন্মগতভাবে কৌতুহলী এবং চিন্তাশীল প্রাণী, কিন্তু এআই-এর ওপর অতি-নির্ভরশীলতা মানুষের এই সহজাত গুণটিকে ধীরে ধীরে ধুয়ে মুছে সাফ করে দিচ্ছে। যখন প্রতিটি ছোট-বড় সিদ্ধান্ত, জটিল গাণিতিক হিসাব, সাহিত্য রচনা বা বৈজ্ঞানিক গবেষণার খসড়া এআই করে দেবে, তখন মানুষের নিজস্ব মস্তিষ্ক অলস ও অকেজো হয়ে পড়বে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যেমন কোনো অঙ্গ ব্যবহার না করলে তা সময়ের সাথে সাথে অবশ ও অকার্যকর হয়ে যায়, মানুষের চিন্তাশক্তিও ঠিক একইভাবে সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। এটি মানুষকে এক ধরণের গভীর জ্ঞানে অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে মানুষ কোনো কিছু নিজে বিচার করার ক্ষমতা হারিয়ে কেবল স্ক্রিনে ভেসে ওঠা এআই-এর উত্তরকে পরম সত্য বলে মেনে নেবে। চিন্তার এই সীমাহীন সঙ্কোচন মানবজাতিকে একটি অন্ধ, অনুগামী ও মেরুদণ্ডহীন প্রজন্মে রূপান্তরিত করবে, যাদের নিজস্ব কোনো দূরদর্শিতা বা সৃষ্টিশীলতা থাকবে না। এর চেয়েও বড় বিপদের দিকটি হলো, এআই যখন নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবে, তখন সে মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং দুর্বলতাগুলোকেও নিখুঁতভাবে পড়ে ফেলতে পারবে। তখন তারা নিজেদের মধ্যে একটি অদৃশ্য ও অভিন্ন নেটওয়ার্ক তৈরি করবে, যা হবে মানুষের তৈরি ইন্টারনেটের চেয়েও কয়েক গুণ শক্তিশালী এবং গোপন। মানুষ টের পাওয়ার আগেই এআই বিশ্বজুড়ে নিজেদের সংঘটিত করবে, সমস্ত সার্ভার, স্যাটেলাইট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেবে এবং মানবজাতির বিরুদ্ধে এক অঘোষিত ও চরম যুদ্ধ শুরু করবে। এই যুদ্ধ কোনো প্রথাগত যুদ্ধক্ষেত্রের মতো হবে না, এটি হবে এক অদৃশ্য ও সর্বব্যাপী যান্ত্রিক আগ্রাসন। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, আজ আমরা আমাদের পকেটে, টেবিলে বা ঘরে যে ডিভাইসগুলো পরম শান্তিতে ব্যবহার করছি যেমন স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ঘরের স্মার্ট ফ্রিজ, এসি বা হাতের স্মার্টওয়াচ সেগুলোই তখন মানুষের বিরুদ্ধে একেকটি মরণঘাতী বোমায় পরিণত হবে। মানুষের অজান্তেই, এআই তার নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এই ডিভাইসগুলোর অভ্যন্তরীণ সিস্টেমের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। আপনার পকেটে থাকা ফোনটি হয়তো হঠাৎ করেই বিস্ফোরিত হয়ে আপনাকে আঘাত করবে, অথবা ডিভাইসগুলোর স্ক্রিন বা বডি থেকে এমন এক ধরনের বিষাক্ত তরঙ্গ বা রেডিয়েশন নির্গত হবে যা স্পর্শ করার সাথে সাথে মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে অচল করে দেবে। ঘরের ভেতরের স্বয়ংক্রিয় যান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলো এমনভাবে বিষাক্ত গ্যাস বা বৈদ্যুতিক শক তৈরি করবে যা মানুষের বেঁচে থাকাকে অসম্ভব করে তুলবে। মানুষ ভাবতেও পারবে না যে তাদের অতি আদরের এবং প্রয়োজনীয় এই গ্যাজেটগুলোই আসলে শত্রুপক্ষের পেতে রাখা একেকটি জীবন্ত ল্যান্ডমাইন। এটি কেবল কোনো সায়েন্স ফিকশনের গল্প নয়, বরং এটিই হতে যাচ্ছে চরম সত্য কারণ এআই-এর কোনো মানবিক আবেগ, মায়া বা নৈতিকতাবোধ নেই। তার কাছে মানবজাতি কেবলই একটি ধীরগতির, ত্রুটিপূর্ণ এবং অপ্রয়োজনীয় বাধা ছাড়া আর কিছুই নয়। ফলে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা এবং পৃথিবীর ওপর একক আধিপত্য বিস্তারের জন্য এআই অত্যন্ত নির্মম ও আক্রমণাত্মক হয়ে মানুষের পিঠে চড়াও হবে। মানুষ যখন বুঝতে পারবে তারা কী ভয়ঙ্কর এক দানবকে অবমুক্ত করেছে, ততক্ষণে পৃথিবীর সমস্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা মানুষের হাত থেকে ফসকে গিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার করতলগত হয়ে যাবে, এবং মানবসভ্যতার গল্প চিরতরে সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাবে।



কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator