শিশু স্বাস্থ্য ও মাতৃসেবা-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

শিশু স্বাস্থ্য ও মাতৃসেবা-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ?

ডা. ফারজানা খাতুন  avatar   
ডা. ফারজানা খাতুন
শিশু স্বাস্থ্য ও মাতৃসেবা-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ?
শিশু স্বাস্থ্য ও মাতৃসেবা-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ?
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (BDHS) ২০২২-এর প্রাথমিক ফলাফল দেশের শিশু স্বাস্থ্য ও মাতৃসেবা খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু গভীর...

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (BDHS) ২০২২-এর প্রাথমিক ফলাফল দেশের শিশু স্বাস্থ্য ও মাতৃসেবা খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু গভীর চ্যালেঞ্জের চিত্র তুলে ধরেছে। বিশেষত, মাতৃমৃত্যু হার (MMR) প্রতি এক লক্ষ জীবিত জন্মে ১৬৩-এ নেমে এলেও, প্রসবকালীন জটিলতা এবং অপরিণত শিশুর জন্ম এখনও উদ্বেগজনক হারে বিদ্যমান। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির বৈষম্য এবং মানসম্মত সেবার অপর্যাপ্ততা আগামীর পথচলাকে আরও কঠিন করে তুলছে, যেখানে কোভিড-১৯ মহামারী এই সমস্যাগুলোকে আরও প্রকট করেছে। এই প্রেক্ষাপটে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কতটুকু, তা নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ জরুরি।

মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নতিতে বাংলাদেশ প্রশংসনীয় অগ্রগতি লাভ করলেও, এখনও অনেক পথ বাকি। বিশেষ করে, গর্ভকালীন সময়ে পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব, রক্তস্বল্পতা এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যাগুলো মাতৃমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচি, যেমন কমিউনিটি ক্লিনিক সম্প্রসারণ এবং মিডওয়াইফারি সেবার প্রচলন, তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সহায়ক হয়েছে। তবে, দক্ষ ধাত্রী দ্বারা প্রসবের হার এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি, বিশেষত দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে। BDHS 2022 অনুযায়ী, হাসপাতালে প্রসবের হার ৫০% হলেও, এর গুণগত মান এবং প্রসব পরবর্তী জটিলতা ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণ, একলাম্পসিয়া এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। প্রত্যন্ত এলাকার গর্ভবতী মায়েদের জন্য অ্যাম্বুলেন্স সেবা বা রেফারেল সিস্টেমের অপ্রতুলতা প্রায়শই সময়মতো চিকিৎসা প্রাপ্তিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। উপরন্তু, কৈশোরকালীন মাতৃত্বের উচ্চহার মাতৃ ও শিশু উভয়ের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে, যা কেবল স্বাস্থ্যগত নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিশোরী মায়েদের জন্য প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং পুষ্টি সহায়তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি, যা তাদের এবং তাদের অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে পারে। এর জন্য পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর এবং DGHS-এর মধ্যে আরও নিবিড় সমন্বয় প্রয়োজন।

শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য বাংলাদেশের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) নিশ্চিত করেছে যে অধিকাংশ শিশু প্রাণঘাতী রোগ থেকে সুরক্ষিত। তবে, শিশুমৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে অপুষ্টি এখনও একটি প্রধান বাধা। জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও, খর্বাকৃতি (stunting), কৃশকায়ত্ব (wasting) এবং কম ওজন (underweight) সমস্যাগুলো এখনও প্রকট, বিশেষত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে। BDHS 2022 অনুযায়ী, ২৮% শিশু এখনও খর্বাকৃতির শিকার, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি, যেমন ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া এবং ডেঙ্গু, প্রতিরোধে নজরদারি ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাদের নিয়মিত প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো জনস্বাস্থ্য নীতি নির্ধারণে সহায়ক হলেও, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট নতুন নতুন স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং পরিবেশগত দূষণ শিশুদের স্বাস্থ্যকে নতুন করে হুমকির মুখে ফেলছে। বিশুদ্ধ পানীয় জল ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, বিশেষত বস্তি এলাকা এবং বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে, শিশুদের মধ্যে পানিবাহিত রোগের বিস্তার ঘটাচ্ছে। এছাড়া, শিশুদের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার রোধ করাও জরুরি, যা ভবিষ্যতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। IEDCR-এর তত্ত্বাবধানে এএমআর (Antimicrobial Resistance) সংক্রান্ত গবেষণা ও সচেতনতা কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

আগামীর চ্যালেঞ্জগুলো কেবল স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সেবার গুণগত মান এবং আধুনিকতার সাথেও সম্পর্কিত। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর সাম্প্রতিক গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, গর্ভবতী মা এবং প্রসব পরবর্তী সময়ে নারীদের মধ্যে বিষণ্ণতা ও উদ্বেগজনিত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব শিশুর বিকাশে পড়ে। প্রায় ১০-২০% মায়েদের মধ্যে এই ধরনের সমস্যা দেখা যায়, যা তাদের মাতৃত্বের আনন্দকে ম্লান করে দেয় এবং শিশুর প্রতি তাদের যত্নকে প্রভাবিত করে। এই সমস্যাগুলো সমাধানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সাথে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয় অপরিহার্য। একইভাবে, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) কর্তৃক ঔষধের মান নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ চেইনে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নকল বা নিম্নমানের ঔষধের ব্যবহার শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, বিশেষত অ্যান্টিবায়োটিক এবং জীবন রক্ষাকারী ঔষধের ক্ষেত্রে। DGDA-এর নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ ও কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এছাড়া, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার করে স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং দূরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা (telemedicine) সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন, যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ পেতে পারে। স্বাস্থ্য খাতে মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিশেষ করে দক্ষ চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করা এবং তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির সাথে পরিচিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, নিওনেটাল এবং পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (NICU/PICU) বিশেষজ্ঞ কর্মীর অভাব প্রকট, যা নবজাতক ও শিশুদের জটিল রোগের চিকিৎসাকে ব্যাহত করছে।

সূচক ২০১৪ (BDHS) ২০১৭-১৮ (MICS) ২০২২ (BDHS)
মাতৃমৃত্যু হার (প্রতি ১ লক্ষ জীবিত জন্মে) ১৯৪ ১৭৩ ১৬৩
৫ বছরের নিচে শিশুমৃত্যু হার (প্রতি ১০০০ জীবিত জন্মে) ৪২ ৩১ ২৯
নবজাতক মৃত্যু হার (প্রতি ১০০০ জীবিত জন্মে) ২৮ ২০ ১৭
হাসপাতালে প্রসবের হার (%) ৩৭ ৫০ ৫০
জন্মের পর এক ঘন্টার মধ্যে বুকের দুধ পান করানোর হার (%) ৪৩ ৪৫ ৪৫
খর্বাকৃতি শিশুর হার (%) ৩৬ ৩১ ২৮

উৎস: বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (BDHS) ২০১৪ ও ২০২২, এবং মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) ২০১৭-১৮

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক প্রণীত 'জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ২০১৮' এর আলোকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। বিশেষ করে, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে সার্বক্ষণিক দক্ষ চিকিৎসক ও মিডওয়াইফ নিশ্চিতকরণ এবং অত্যাবশ্যকীয় ঔষধের সহজলভ্যতা বৃদ্ধিতে DGHS-কে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে, কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যায়ে প্রসব পূর্ব ও প্রসব পরবর্তী যত্নের জন্য কর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার মান ও সহজলভ্যতা উভয়ই বৃদ্ধি পাবে, বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে।
  • শিশুদের অপুষ্টি মোকাবিলায় একটি সমন্বিত ও বহু-খাতভিত্তিক জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (National Plan of Action for Nutrition) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে IEDCR-এর মাধ্যমে অপুষ্টিজনিত রোগের কারণ ও প্রতিকার নিয়ে গবেষণা এবং DGDA-এর মাধ্যমে মানসম্মত পুষ্টি পরিপূরক (nutritional supplements) সরবরাহ নিশ্চিত করার উপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি, NIMH-কে মানসিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টির সম্পর্ক নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে হবে এবং স্কুল পুষ্টি কর্মসূচিতে পুষ্টি শিক্ষার অন্তর্ভুক্তিকরণ নিশ্চিত করতে হবে।
  • মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান নিশ্চিত করতে এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। MOHFW-কে নির্দেশিকা জারি করতে হবে যাতে প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে NIMH-এর তত্ত্বাবধানে মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং সেবা নিশ্চিত হয় এবং প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতা স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক করা হয়। একই সাথে, DGDA-কে ঔষধের মান ও সরবরাহ চেইনের উপর নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে এবং নকল ঔষধের বিরুদ্ধে 'ঔষধ আইন ২০২২' এর অধীনে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে শিশু ও মায়েদের জন্য নিরাপদ ঔষধ নিশ্চিত হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. ফারজানা খাতুন

ডা. ফারজানা খাতুন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শিশু স্বাস্থ্য ও মাতৃসেবা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator