স্মার্ট সিটি, আরবান প্ল্যানিং ও আর্কিটেকচার: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

স্মার্ট সিটি, আরবান প্ল্যানিং ও আর্কিটেকচার: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ

স্থপতি তামিম  avatar   
স্থপতি তামিম
স্মার্ট সিটি, আরবান প্ল্যানিং ও আর্কিটেকচার: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
স্মার্ট সিটি, আরবান প্ল্যানিং ও আর্কিটেকচার: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কর্তৃক উপস্থাপিত ‘ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান (২০১৬-২০৩৫)’ এর বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনাকালে দেখা গেছে, নির্ধারিত লক্ষ্...

সম্প্রতি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কর্তৃক উপস্থাপিত ‘ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান (২০১৬-২০৩৫)’ এর বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনাকালে দেখা গেছে, নির্ধারিত লক্ষ্যের মাত্র ৩০% অর্জিত হয়েছে, যা দেশের অন্যান্য নগরীর ‘স্মার্ট সিটি’ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও এক হতাশাজনক চিত্র। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) সমর্থিত একাধিক আরবান ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভে বিনিয়োগ সত্ত্বেও, সমন্বিত পরিকল্পনা, ডিজাইন বাস্তবায়ন ও প্রযুক্তির ব্যবহারে যে মৌলিক ঘাটতি রয়ে গেছে, তা আর লুকানো সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বাস্তবায়নাধীন ‘স্মার্ট পোর্ট সিটি’ ধারণার প্রাথমিক ধাপেই আন্তঃসংস্থা সমন্বয়হীনতা ও ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতার কারণে প্রকল্পের গতি মন্থর হয়ে পড়েছে। এই অবস্থা কেবল একটি প্রকল্পের নয়, বরং বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনা ও স্থাপত্য খাতের সামগ্রিক ব্যর্থতার এক প্রতিচ্ছবি, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের ‘স্মার্ট সিটি’ ধারণা এবং আরবান প্ল্যানিংয়ের ব্যর্থতার মূলে রয়েছে একাধিক কাঠামোগত দুর্বলতা ও দৃষ্টিভঙ্গির অভাব। প্রাথমিকভাবে, নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোর (যেমন: রাজউক, সিডিএ, কেডিএ) মধ্যে কার্যকারিতা ও সমন্বয়ের অভাব প্রকট। প্রতিটি সংস্থা নিজস্ব আইন ও বিধি দ্বারা পরিচালিত হয়, যা প্রায়শই একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনার পথে বাধা সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা শহরের জন্য রাজউক ‘ড্যাপ’ (ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান) তৈরি করলেও, ওয়াসা, ডিপিডিসি, সিটি কর্পোরেশন এবং অন্যান্য সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলো তাদের নিজস্ব উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে এগোয়, যা প্রায়শই ড্যাপের সাথে সাংঘর্ষিক হয়। এতে করে অবকাঠামো নির্মাণে দ্বৈততা, সম্পদের অপচয় এবং নাগরিক সেবার মান নিম্নমুখী হয়। বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ এর এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এই সমন্বয়হীনতাকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উপরন্তু, নগর পরিকল্পনা প্রণয়নে জনসাধারণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হওয়ায় এবং স্থানীয় চাহিদা ও সংস্কৃতির প্রতি উদাসীনতা দেখা যায়, যা প্রকল্পগুলোকে স্থানীয়দের কাছে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলে। এই ধরনের কেন্দ্রীভূত ও জনবিচ্ছিন্ন পরিকল্পনা পদ্ধতি স্মার্ট সিটির মূল ভিত্তি, অর্থাৎ নাগরিক-কেন্দ্রিকতা থেকে বিচ্যুত হয়।

স্থাপত্য ও নগর নকশার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সংকট বিদ্যমান। বেশিরভাগ আরবান প্রকল্পগুলোতে ‘গ্লোবাল বেস্ট প্র্যাকটিস’ অনুসরণ করার নামে স্থানীয় জলবায়ু, ঐতিহ্য এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটকে উপেক্ষা করে একমুখী নকশা চাপিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে তৈরি হয় এমন সব স্থাপনা ও জনপরিসর যা শহরের চরিত্র ও পরিবেশের সঙ্গে বেমানান। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা (Building Construction Rules) থাকলেও এর দুর্বল প্রয়োগ এবং অসাধু চক্রের যোগসাজশে নিয়ম লঙ্ঘন অহরহ দেখা যায়। বিশেষ করে বহুতল ভবন নির্মাণে ফায়ার সেফটি, উন্মুক্ত স্থান (Open Space) এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্তাবলী প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। দেশের প্রথিতযশা স্থাপত্যবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদগণ বারবার এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করলেও, কার্যকর পদক্ষেপের অভাব পরিলক্ষিত হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের ‘আরবান ডেভেলপমেন্ট পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক’ এ উল্লেখ করেছে যে, শুধু আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং স্থানীয় সংস্কৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ডিজাইন এবং সবুজ স্থাপত্যের (Green Architecture) নীতি অনুসরণ করা স্মার্ট সিটির জন্য অপরিহার্য। এর অভাব কেবল নান্দনিকতার ক্ষতি করে না, বরং নগরীর পরিবেশগত ভারসাম্য ও দুর্যোগ সহনশীলতাও হ্রাস করে।

স্মার্ট সিটি বাস্তবায়নে আরেকটি বড় ব্যর্থতা হলো প্রযুক্তিগত সমন্বয়হীনতা এবং অর্থায়নের টেকসই মডেলের অভাব। ‘স্মার্ট’ উপাদান যুক্ত করার নামে বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন প্রযুক্তিগত সমাধান প্রয়োগ করা হয়, যা একটি সমন্বিত ‘স্মার্ট ইকোসিস্টেম’ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। উদাহরণস্বরূপ, স্মার্ট ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, স্মার্ট ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট এবং ডিজিটাল পাবলিক সার্ভিস প্ল্যাটফর্মগুলো প্রায়শই একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে পারে না বা একই ডেটাবেস ব্যবহার করে না। এতে ডেটা সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা পৃথকভাবে প্রযুক্তি প্রকল্প গ্রহণ করে, কিন্তু একটি কেন্দ্রীয় ‘আরবান ডেটা ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ তৈরি না হওয়ায় প্রযুক্তির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যায় না। এছাড়া, স্মার্ট সিটি প্রকল্পগুলোর জন্য প্রাথমিকভাবে বৈদেশিক ঋণ বা অনুদানের ওপর নির্ভরতা দেখা যায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ন এবং প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেল বা অন্যান্য উদ্ভাবনী অর্থায়ন পদ্ধতির পর্যাপ্ত ব্যবহার দেখা যায় না। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা কম হওয়ায় এবং প্রকল্প-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাবে অনেক স্মার্ট উপাদান কিছুদিনের মধ্যেই অকার্যকর হয়ে পড়ে।

স্মার্ট সিটি প্রকল্পের উপাদান লক্ষ্যমাত্রা (২০২৫) বর্তমান অগ্রগতি (২০২৪) প্রাথমিক বাজেট (USD মিলিয়ন) বাস্তব খরচ (USD মিলিয়ন) ব্যর্থতার কারণ
সমন্বিত ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ঢাকার ৭০% প্রধান সড়ক কভার ৪০% কভার ৮০ ৬৫ আন্তঃসংস্থা সমন্বয়হীনতা, ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা
স্মার্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সকল সিটি কর্পোরেশনে ৫০% স্বয়ংক্রিয় ২০% স্বয়ংক্রিয় ৬০ ৩০ প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর অভাব, অর্থায়নে দীর্ঘসূত্রিতা
ডিজিটাল পাবলিক সার্ভিসেস প্ল্যাটফর্ম ৫০টি মৌলিক সেবা অনলাইন ২৫টি সেবা অনলাইন ৫০ ২৫ ডেটা ইন্টিগ্রেশনের অভাব, জনবলের সক্ষমতার ঘাটতি
আরবান গ্রিন স্পেস উন্নয়ন প্রতি ১০০০ জনে ১ একর সবুজ স্থান প্রতি ১০০০ জনে ০.৫ একর ৪০ ৩৫ ভূমি স্বল্পতা, অপরিকল্পিত নগরায়ন, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব

উৎস: গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং বিশ্বব্যাংকের যৌথ সমীক্ষা, ২০২৪।

সুপারিশ

  • জাতীয় নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা: গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি শক্তিশালী 'জাতীয় নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ' (National Urban Development Authority) প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই কর্তৃপক্ষকে 'জাতীয় নগর পরিকল্পনা আইন' (National Urban Planning Act) এর মাধ্যমে আইনগত ক্ষমতা প্রদান করে দেশের সকল নগর উন্নয়ন সংস্থা (যেমন: রাজউক, সিডিএ, কেডিএ) এবং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর (ওয়াসা, ডিপিডিসি) কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত ছাতার নিচে নিয়ে আসতে হবে। এর ফলে কার্যকর আন্তঃসংস্থা সমন্বয় নিশ্চিত হবে এবং মহাপরিকল্পনা (Master Plan) বাস্তবায়নে দ্বৈততা ও সংঘাত পরিহার করা সম্ভব হবে।

  • স্থানীয় স্থাপত্য ও নগর নকশা পর্যালোচনা পর্ষদ গঠন: প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন এবং নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতায় 'স্থানীয় স্থাপত্য ও নগর নকশা পর্যালোচনা পর্ষদ' (Local Architectural and Urban Design Review Board) গঠন করতে হবে। এই পর্ষদকে সংশোধিত 'ইমারত নির্মাণ বিধিমালা' (Building Construction Rules) এবং 'বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড' (BNBC) এর আওতায় পর্যাপ্ত ক্ষমতা প্রদান করতে হবে, যাতে সকল বৃহৎ স্থাপনা এবং নগর উন্নয়ন প্রকল্পের নকশা স্থানীয় সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা যায়। এটি অপরিকল্পিত ও বেমানান স্থাপত্য রোধে এবং সবুজ স্থাপত্যের প্রচলনে সহায়ক হবে।

  • টেকসই স্মার্ট সিটি অর্থায়ন ও ডেটা নীতিমালা প্রণয়ন: স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি 'স্মার্ট সিটি উন্নয়ন তহবিল' (Smart City Development Fund) গঠন করতে হবে, যা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেল এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদার (যেমন World Bank, ADB) থেকে দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নকে উৎসাহিত করবে। একই সাথে, একটি 'জাতীয় আরবান ডেটা ও আইওটি নীতিমালা' (National Urban Data and IoT Policy) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যা সকল স্মার্ট সিটি উপাদানের জন্য একটি সমন্বিত ডেটা কাঠামো, ডেটা সুরক্ষা এবং আন্তঃঅপারেশনালিটি নিশ্চিত করবে। এই নীতিমালার বাস্তবায়নে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কারিগরি সহায়তা অপরিহার্য।


✍️ নিবন্ধ লেখক: স্থপতি তামিম

স্থপতি তামিম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: স্মার্ট সিটি, আরবান প্ল্যানিং ও আর্কিটেকচার। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator