সাম্প্রতিক সময়ে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এবং এটুআই (a2i)-এর কারিগরি সহায়তায় 'মুক্তপাঠ' প্ল্যাটফর্মে শিক্ষকদের অনলাইন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ব্যাপক গতি লাভ করেছে। এই উদ্যোগ কোভিড-১৯ মহামারীর আকস্মিক ধাক্কার পর অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থার অপরিহার্যতা অনুধাবনের এক ফলশ্রুতি। তবে, প্রশ্ন থেকে যায়, এই প্রশিক্ষণের মেরুদণ্ড কতটা মজবুত? বিশেষ করে, ইডটেক (EdTech) প্ল্যাটফর্মগুলোর কার্যকারিতা এবং শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে তাদের ভূমিকা কতটুকু সফল?
অনলাইন শিক্ষায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ শুধু ডিজিটাল টুলস ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এর গভীরে যেতে হবে শিক্ষাপদ্ধতি, ডিজিটাল বিষয়বস্তু তৈরি এবং ভার্চুয়াল পরিবেশে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের কৌশল আয়ত্ত করার দিকে। প্রথমত, মহামারীর সময়ে শিক্ষকরা দ্রুত অনলাইন প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হলেও, তাদের অধিকাংশই প্রয়োজনীয় ডিজিটাল শিক্ষাবিজ্ঞানের (digital pedagogy) জ্ঞান ও দক্ষতা নিয়ে প্রস্তুত ছিলেন না। অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্যমান ইডটেক প্ল্যাটফর্মগুলো কেবল তথ্য সরবরাহের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা ইন্টারেক্টিভ ও ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষার চাহিদা পূরণে ব্যর্থ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, স্থানীয় ইডটেক কোম্পানিগুলো, যাদের অনেককেই বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) সমর্থন করে, তাদের প্ল্যাটফর্মগুলো শিক্ষকের নিবিড় প্রশিক্ষণ এবং ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের জন্য কতটা উপযোগী, তা নিয়ে আরও গবেষণা ও মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে, অনেক প্ল্যাটফর্মই ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতার দিক থেকে এবং শিক্ষকের বহুমুখী চাহিদা পূরণে কাঙ্ক্ষিত মান অর্জন করতে পারেনি। এই সীমাবদ্ধতা শিক্ষকদের ডিজিটাল শিক্ষায় আত্মবিশ্বাসী হতে বাধা দিচ্ছে এবং অনলাইন শিক্ষার মানোন্নয়নে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
দ্বিতীয়ত, অনলাইন শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো এবং নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) সারা দেশে ডিজিটাল অবকাঠামো বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট এখনও একটি চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC)-এর তথ্য অনুযায়ী, মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়লেও, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে স্থিতিশীল ব্রডব্যান্ড সংযোগের প্রাপ্যতা এখনও সর্বত্র নিশ্চিত হয়নি। এটি শিক্ষকদের অনলাইন প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাস পরিচালনায় বড় বাধা সৃষ্টি করে। উপরন্তু, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) বিভিন্ন হাই-টেক পার্কে ইডটেক স্টার্টআপগুলোকে উৎসাহিত করলেও, এই স্টার্টআপগুলোর উৎপাদিত পণ্য বা পরিষেবাগুলো দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূলধারায় কতটা কার্যকরভাবে যুক্ত হচ্ছে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অনেক সময় দেখা যায়, উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন ইডটেক সলিউশন থাকলেও, সেগুলোর ব্যবহারবিধি শিক্ষকদের জন্য সহজবোধ্য নয় অথবা সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও আপগ্রেডেশন প্রক্রিয়া জটিল। এই প্রযুক্তিগত বিচ্ছিন্নতা শিক্ষকদের মধ্যে অনলাইন শিক্ষা গ্রহণের প্রতি অনীহা সৃষ্টি করতে পারে এবং ইডটেকের পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো কঠিন করে তোলে।
তৃতীয়ত, শিক্ষকদের জন্য অনলাইন প্রশিক্ষণের গুণগত মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে কেবল নির্দিষ্ট সফটওয়্যার বা অ্যাপ ব্যবহারের কলাকৌশল শেখানো হয়, কিন্তু অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা, মূল্যায়নের নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ, বা ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ে পর্যাপ্ত ধারণা দেওয়া হয় না। এটুআই (a2i) যদিও শিক্ষকদের জন্য বিভিন্ন মডিউল তৈরি করেছে, সেগুলোর ধারাবাহিক আপডেট এবং শিক্ষকদের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইডটেক প্ল্যাটফর্মগুলো শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণাভিত্তিক উপাদান, কেস স্টাডি, এবং পারস্পরিক শিক্ষণ (peer learning) সুযোগ কতটা প্রদান করছে, তা খতিয়ে দেখতে হবে। শিক্ষকদের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের মধ্যে উদ্ভাবনী শিক্ষাদান পদ্ধতির প্রচলন ঘটানোও ইডটেকের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে, শুধুমাত্র প্রযুক্তি সরবরাহ করাই যথেষ্ট নয়, বরং শিক্ষকদেরকে সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন নতুন শিক্ষণ পদ্ধতি উদ্ভাবনে উৎসাহিত করা এবং প্রয়োজনীয় মানসিক সমর্থন দেওয়াও জরুরি। ইডটেকের মেরুদণ্ড তখনই মজবুত হবে যখন এটি শিক্ষকদেরকে শুধুমাত্র ব্যবহারকারী হিসেবে নয়, বরং সহ-নির্মাতা হিসেবে দেখবে এবং তাদের অভিজ্ঞতা ও মতামতের ভিত্তিতে প্ল্যাটফর্মের উন্নতি সাধন করবে।
| সূচক | ২০২৩ সালের তথ্য | ২০২৪ সালের লক্ষ্যমাত্রা |
|---|---|---|
| অনলাইন শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী (একক) | ১,৫০,০০০+ | ২,৫০,০০০+ |
| ইডটেক প্ল্যাটফর্মে শিক্ষণ উপকরণ আপলোড (সংখ্যা) | ৫০,০০০+ | ৮০,০০০+ |
| ইন্টারনেট সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (শতাংশ) | ৭২% | ৮৫% |
| স্থানীয় ইডটেক স্টার্টআপের সংখ্যা (BASIS নিবন্ধিত) | ৬০+ | ১০০+ |
উৎস: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং এটুআই-এর যৌথ বার্ষিক প্রতিবেদন, ২০২৩-২৪ (আনুমানিক)
সুপারিশ
- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং এটুআই (a2i) যৌথভাবে ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকের মধ্যে শিক্ষকদের জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল শিক্ষাবিজ্ঞান ও সক্ষমতা বৃদ্ধি নীতিমালা প্রণয়ন করবে। এই নীতিমালায় প্রাক-সেবা ও কর্মকালীন শিক্ষক প্রশিক্ষণে ইডটেক টুলস ব্যবহার, অনলাইন বিষয়বস্তু তৈরি এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক দক্ষতা বাধ্যতামূলক করার বিধান অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যা জাতীয় শিক্ষানীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে।
- বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC) ২০২৬ সালের মধ্যে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে, উচ্চগতির ও সাশ্রয়ী ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করতে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করবে। একইসাথে, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) হাই-টেক পার্কগুলোর মধ্যে "ইডটেক ইনোভেশন হাব" প্রতিষ্ঠা করবে, যা শিক্ষকদের চাহিদাভিত্তিক ইডটেক সমাধান তৈরির জন্য প্রযুক্তি কোম্পানি এবং শিক্ষাবিদদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে ইনকিউবেশন সহায়তা প্রদান করবে।
- বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের মধ্যে একটি 'জাতীয় ইডটেক উপদেষ্টা পরিষদ' গঠন করবে। এই পরিষদে বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ এবং ইডটেক কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন, যার প্রধান কাজ হবে শিক্ষাবিদদের জন্য ব্যবহারিক, গবেষণানির্ভর প্রশিক্ষণ মডিউল এবং সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম তৈরির রূপরেখা প্রণয়ন করা, যা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হবে।