সম্প্রতি বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) প্রকাশিত 'কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ (TVET) পরিসংখ্যান ২০২২' প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা কার্যক্রমে নারী শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও সামগ্রিক ভর্তি সংখ্যায় এই অগ্রগতি প্রশংসনীয়, তবে নির্দিষ্ট কিছু ঐতিহ্যগতভাবে পুরুষ-অধ্যুষিত ক্ষেত্রে নারীর প্রতিনিধিত্ব এখনও তুলনামূলকভাবে কম। এই বাস্তব চিত্রটি দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিক্ষার মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তা তৈরি ও ক্ষমতায়নের কৌশলগুলোকে আরও নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে। এটি কেবল সংখ্যাগত বৃদ্ধি নয়, বরং গুণগত ক্ষমতায়নের দিকে একটি সুসংহত পদক্ষেপের আবশ্যকতা নির্দেশ করে।
জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) দেশের কর্মসংস্থান বাজারের চাহিদা পূরণের জন্য দক্ষতা প্রশিক্ষণের মানদণ্ড নির্ধারণ এবং একটি সুসংহত যোগ্যতা কাঠামো প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। NSDA-এর মূল কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় পেশাগত দক্ষতা মান (NOSS) তৈরি করা, প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মান নিশ্চিত করা এবং দক্ষতা সনদ প্রদান করা। 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি, ২০১৯' অন্তর্ভুক্তিমূলক দক্ষতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও, এর বাস্তবায়নে প্রায়শই কিছু কাঠামোগত বাধা দেখা যায় যা নারীদের নির্দিষ্ট কিছু ট্রেডে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখে। উদাহরণস্বরূপ, অনেক NSDA অনুমোদিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে, বিশেষ করে গ্রামীণ ও আধা-শহুরে এলাকায়, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক শৌচাগার, নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা, বা নমনীয় প্রশিক্ষণ সময়সূচীর অভাব রয়েছে যা তাদের পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর ফলে, উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন হলেও সাংস্কৃতিক বা লজিস্টিক কারণে নারীদের জন্য চ্যালেঞ্জিং এমন প্রোগ্রামগুলোতে তাদের অংশগ্রহণ কম হয়। উপরন্তু, NSDA-অনুমোদিত কিছু পাঠ্যক্রমের বিষয়বস্তু, কারিগরি দিক থেকে উন্নত হলেও, নারী উদ্যোক্তাদের অনুপ্রাণিত করার জন্য লিঙ্গ-নির্দিষ্ট কেস স্টাডি বা রোল মডেল অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগগুলো প্রায়শই হাতছাড়া করে। NSDA-এর কাঠামোর মাধ্যমে নারীদের প্রকৃত ক্ষমতায়নের জন্য, প্রশিক্ষণ প্রদানকারীদের জন্য লিঙ্গ-সংবেদনশীল অবকাঠামো, পাঠ্যক্রমের অভিযোজন, এবং প্রশিক্ষণ-পরবর্তী সহায়তা ব্যবস্থার উপর সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা তৈরি করা অপরিহার্য। এটি কেবল কোর্স অফার করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, এমন একটি পরিবেশ তৈরি করবে যেখানে নারীরা দক্ষতা অর্জন করে আত্মবিশ্বাসের সাথে সেগুলোকে টেকসই জীবিকা এবং উদ্যোক্তা উদ্যোগে রূপান্তরিত করতে পারবে, যা জাতীয় অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির বৃহত্তর লক্ষ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়ন, পাঠ্যক্রম নির্ধারণ এবং লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। UGC-এর নিরলস প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ উচ্চশিক্ষা স্তরে নারী শিক্ষার্থীর সামগ্রিক ভর্তি সংখ্যায় একটি প্রশংসনীয় বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে, জ্ঞান-ভিত্তিক অর্থনীতি এবং উচ্চ-প্রবৃদ্ধি উদ্যোক্তা খাতের জন্য অত্যাবশ্যকীয় কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীর বিশ্লেষণ করলে এখনও লিঙ্গ বৈষম্য দেখা যায়। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত (STEM) ক্ষেত্রগুলিতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে কম, যদিও উদ্ভাবন এবং জাতীয় উন্নয়নে এগুলোর গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। 'উচ্চশিক্ষা কৌশলপত্র, ২০১৭' সকল ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির উপর জোর দেয়, কিন্তু STEM ক্ষেত্রে নারীদের সক্রিয়ভাবে উৎসাহিত করা এবং তাদের উদ্যোক্তা পথে পরিচালিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়াগুলি এখনও অসম্পূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, UGC-এর তত্ত্বাবধানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সফল নারী উদ্যোক্তা বা গবেষকদের সাথে নারী শিক্ষার্থীদের সংযোগ স্থাপনের জন্য নিবেদিত "উইমেন ইন STEM" মেন্টরশিপ প্রোগ্রামের অভাব রয়েছে। উপরন্তু, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপনে উৎসাহিত করা হলেও, নারী শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ধারণাকে সমর্থন করার জন্য তাদের নির্দিষ্ট প্রচার এবং সহায়তা কাঠামো প্রায়শই অপর্যাপ্ত। UGC, উদাহরণস্বরূপ, বিশ্ববিদ্যালয় ইনকিউবেশন সেন্টারগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করতে পারে, যেখানে নারী-নেতৃত্বাধীন স্টার্টআপগুলোর জন্য নির্দিষ্ট শতাংশ সম্পদ বা স্থান বরাদ্দ রাখা হবে। এর সাথে মেধা সম্পত্তি অধিকার, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সংগ্রহ, এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বাজার প্রবেশের কৌশল সম্পর্কিত বিশেষ প্রশিক্ষণ যুক্ত করা যেতে পারে। শিক্ষাগত অর্জনকে নারীর জন্য বাস্তব অর্থনৈতিক ক্ষমতায় রূপান্তরিত করতে হলে কেবল ভর্তি সংখ্যা বৃদ্ধির পরিবর্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উদ্যোক্তা ইকোসিস্টেম সক্রিয়ভাবে গড়ে তোলার দিকে একটি কৌশলগত পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি।
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং 'কর্মসংস্থানের জন্য দক্ষতা বিনিয়োগ কর্মসূচি' (SEIP) দেশের দক্ষতা ব্যবধান পূরণে এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রচারে, বিশেষ করে নারীদের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে একীভূত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। SEIP, বিভিন্ন উন্নয়ন অংশীদারদের সহায়তায় পরিচালিত একটি ফ্ল্যাগশিপ সরকারি উদ্যোগ, আইটি এবং হালকা প্রকৌশল থেকে শুরু করে বিশেষায়িত পোশাক তৈরি পর্যন্ত বিভিন্ন চাহিদা-ভিত্তিক ট্রেডে হাজার হাজার নারীসহ অসংখ্য ব্যক্তিকে সফলভাবে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তবে, এই প্রশিক্ষিত নারীদের দক্ষ কর্মী থেকে একজন ক্ষমতাপ্রাপ্ত উদ্যোক্তায় রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়াটি এখনও উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। যদিও SEIP-এর অধীনে প্রদত্ত প্রশিক্ষণ মডিউলগুলো, যা প্রায়শই কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি দক্ষতা প্রদান করে, তবে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক ব্যবসায়িক দক্ষতাগুলো শেখাতে প্রায়শই ব্যর্থ হয়। ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি, প্রাথমিক হিসাবরক্ষণ, ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য ডিজিটাল বিপণন, অথবা নতুন উদ্যোগের জন্য আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো সম্পর্কে ধারণা প্রদানের মডিউলগুলো প্রায়শই অগভীর বা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকে। উপরন্তু, নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ-পরবর্তী সহায়তা, সকল SEIP প্রকল্পের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী নয়। অনেক প্রশিক্ষিত নারী তাদের পণ্য বা পরিষেবার জন্য প্রাথমিক মূলধন, বাজার সংযোগ, বা তাদের ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য চলমান মেন্টরশিপ পেতে অসুবিধায় পড়েন। BANBEIS-এর কারিগরি শিক্ষায় নারী ভর্তির তথ্য, যদিও নারী অংশগ্রহণের বৃদ্ধি দেখাচ্ছে, তবে একটি শক্তিশালী সহায়তা ব্যবস্থা ছাড়া এই সংখ্যাগুলো বাস্তব উদ্যোক্তা সফলতায় রূপান্তরিত হয় না বলে পরোক্ষভাবে এই শূন্যতা তুলে ধরে। এই নারীদের সত্যিকার অর্থে ক্ষমতায়ন করতে হলে, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং SEIP-কে তাদের মূল পাঠ্যক্রমে ব্যাপক উদ্যোক্তা মডিউল অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় চেম্বার অফ কমার্সের সাথে প্রশিক্ষণ-পরবর্তী সহায়তার জন্য আনুষ্ঠানিক অংশীদারিত্ব স্থাপন করতে হবে, এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নেটওয়ার্কিং ও মেন্টরশিপের জন্য নিবেদিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। এর মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন টেকসই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে রূপান্তরিত হবে।
| সূচক | ২০১৮ | ২০২০ | ২০২২ |
|---|---|---|---|
| কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় নারী শিক্ষার্থীর হার (BANBEIS) | ২৬.৫% | ৩০.২% | ৩৪.৭% |
| বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের STEM অনুষদে নারী শিক্ষার্থী (UGC) | ২৩.৮% | ২৪.৫% | ২৫.১% |
| NSDA অনুমোদিত প্রোগ্রামে নারী প্রশিক্ষণার্থী | ৪৩,৫০০ | ৫২,১০০ | ৬১,৩০০ |
| SEIP এর আওতায় দক্ষতা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী | ১৮৫,০০০ | ২২০,০০০ | ২৭৫,০০০ |
| কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর পরিচালিত বিশেষ মহিলা পলিটেকনিকে আসন পূরণ (শতাংশ) | ৮২% | ৮৫% | ৮৮% |
উৎস: BANBEIS (বিভিন্ন শিক্ষা পরিসংখ্যান প্রতিবেদন), UGC (বার্ষিক প্রতিবেদন), NSDA (প্রগতি প্রতিবেদন), SEIP (প্রকল্প মূল্যায়ন প্রতিবেদন), কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (বার্ষিক প্রকাশনা)
সুপারিশ
- কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং NSDA যৌথভাবে "নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন মডিউল" প্রবর্তন করবে। এই মডিউলগুলো তাদের বিদ্যমান কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যেখানে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, বাজার বিশ্লেষণ, এবং আইনি কাঠামো সংক্রান্ত ব্যবহারিক জ্ঞান প্রদান করা হবে, বিশেষত 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি, ২০১৯' এর অধীনে।
- UGC সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি "নারী উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তা ইনকিউবেশন সেন্টার" প্রতিষ্ঠার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করবে। এই নীতিমালা STEM অনুষদের নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষায়িত মেন্টরশিপ, গবেষণা অনুদান, এবং প্রাথমিক বাজার সংযোগের সুবিধা নিশ্চিত করবে, যা 'উচ্চশিক্ষা কৌশলপত্র, ২০১৭' এর লক্ষ্যগুলোর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
- SEIP এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর নারী প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য প্রশিক্ষণের পর একটি বাধ্যতামূলক 'পোস্ট-ট্রেনিং সাপোর্ট প্রোগ্রাম' চালু করবে। এই প্রোগ্রামের আওতায় প্রশিক্ষিত নারীদেরকে তিন মাস পর্যন্ত বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ, প্রাথমিক বাজার সংযোগের সহায়তা, এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সহায়তা প্রদান করা হবে, যা 'জাতীয় শিল্পনীতি, ২০১৬' এর নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণ করবে।