বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি সংকট: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয় | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি সংকট: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়

প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম  avatar   
প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম
বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি সংকট: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়
বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি সংকট: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) দৈনিক উৎপাদন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত গ...

সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) দৈনিক উৎপাদন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত গ্রীষ্মকালে পিক আওয়ারে প্রায়শই ২,০০০ থেকে ৩,০০০ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে, যা দেশের শিল্প উৎপাদন এবং জনজীবনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, বিশেষ করে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চ মূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি এবং ডলার সংকটের কারণে জ্বালানি আমদানিতে সৃষ্ট সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতি দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে এবং জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করার প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা বর্তমানে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় এবং নতুন আবিষ্কারের অভাবে, সরকার বাধ্য হয়েছে এলএনজি আমদানি বাড়াতে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং একইসাথে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলস্বরূপ, অনেক গ্যাস-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না, এমনকি কিছু তেল-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও জ্বালানির অভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর 'ক্যাপাসিটি পেমেন্ট' হিসেবে বিপুল অঙ্কের টাকা গুণতে হচ্ছে, যা জাতীয় বাজেটের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে। বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) উভয়ই তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এই উচ্চ আমদানি নির্ভরতা এবং এর আর্থিক ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বিদ্যুৎ খাতের এই সংকট কেবল জ্বালানি আমদানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর গভীরে রয়েছে কাঠামোগত দুর্বলতা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাব। গত দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেও, প্রাথমিক জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে ধীরগতি এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এছাড়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, ভূমি অধিগ্রহণ, গ্রিড ইন্টিগ্রেশন এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে জটিলতার কারণে এই খাতের উন্নয়ন আশানুরূপ হয়নি। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ গ্রিড আধুনিকীকরণ এবং স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তির প্রয়োগেও ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় অপচয় কমানো এবং স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারতো। সরকার যদিও ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ৪০% বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তবে বর্তমান বাস্তবতায় সেই লক্ষ্য অর্জন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে, যদি না সুনির্দিষ্ট এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করতে নিচের সারণীতে কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্য তুলে ধরা হলো:

জ্বালানির প্রকার মোট উৎপাদন ক্ষমতা (মেগাওয়াট) মোট উৎপাদনে অংশীদারিত্ব (%) (২০২৩-২৪) আমদানি নির্ভরতা (%) (প্রাথমিক জ্বালানি)
প্রাকৃতিক গ্যাস ১১,৮০০ ৪৫% ৩৫% (এলএনজি)
ফার্নেস তেল (HFO) ৬,৫০০ ২৫% ১০০%
কয়লা ৩,৫০০ ১২% ৯০%
নবায়নযোগ্য (সৌর, জলবিদ্যুৎ) ১,২০০ ৪% ০%
পারমাণবিক ১,২০০ (নির্মাণাধীন) ০% ১০০% (ইউরেনিয়াম)
ডিজেল ১,০০০ ৩% ১০০%
অন্যান্য (আমদানিকৃত বিদ্যুৎ) ১,৬০০ ৬% ১০০%
মোট ২৭,৮০০ (প্রায়) ১০০% -

উৎস: বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রক্ষেপণ।

সুপারিশ

  • বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং পেট্রোবাংলাকে অবিলম্বে দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে ব্যাপক বিনিয়োগ এবং কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন বিশ্বব্যাংক বা এডিবি-এর প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করা যেতে পারে।
  • টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এর মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি (বিশেষ করে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ) প্রকল্পের বাস্তবায়ন দ্রুততর করতে হবে। এজন্য একটি বিশেষ "নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্রুত বাস্তবায়ন তহবিল" গঠন করে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং গ্রিড ইন্টিগ্রেশনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যা বাংলাদেশ সরকারের ২০৩০ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহায়ক হবে।
  • পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-কে দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ গ্রিড আধুনিকীকরণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে। স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি এবং আধুনিক লোড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম প্রবর্তনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় গ্রিড আধুনিকীকরণ নীতি (National Grid Modernization Policy) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা আবশ্যক, যা বিদ্যুৎ অপচয় কমিয়ে গ্রিডের স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করবে এবং ভবিষ্যৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংহতকরণে সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম

প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি সংকট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator