সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য তথাকথিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও আইপি টিভি, যেগুলোর সিংহভাগেরই নেই কোনো সরকারি বৈধ নিবন্ধন। নামমাত্র পেজ খুলে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে এসব ব্যক্তি সংবাদ পরিবেশনের নামে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থানীয় মূলধারার গণমাধ্যমের নামের সাথে মিল রেখে বা ভুয়া লোগো ব্যবহার করে এসব অনিবন্ধিত পেজ পরিচালিত হচ্ছে, যা পেশাদার সাংবাদিকতার মানদণ্ডকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কোনো ধরনের তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়াই অতিরঞ্জিত ও ভিত্তিহীন সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির অভিযোগ উঠেছে এসব পেজ পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী যেকোনো অনলাইন গণমাধ্যম পরিচালনার জন্য সরকারি নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হলেও গোলাপগঞ্জের এসব পেজ পরিচালনাকারীরা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবাধে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
ভুয়া নিউজ পেজের এমন দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ স্থানীয় ভুক্তভোগীরা। সাধারণ মানুষ এসব পেজের জমকালো লোগো ও পেশাদারিত্বের অভিনয় দেখে সেগুলোকে প্রকৃত সংবাদমাধ্যম মনে করে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব তথাকথিত সাংবাদিকরা অনেক সময় ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতে বা আর্থিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে কারো বিরুদ্ধে মানহানিকর সংবাদ প্রচার করছেন। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, পেশাদার সাংবাদিকতার আড়ালে যারা এই অপতৎপরতা চালাচ্ছে, তারা মূলত সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। একজন স্থানীয় ভুক্তভোগী বলেন, যাচাই-বাছাইহীন এসব খবরের কারণে অনেক সময় সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হতে হচ্ছে, অথচ প্রতিকার চাওয়ার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ খুঁজে পাওয়া দায়। সংবাদ পরিবেশনের নামে এই অনিয়ন্ত্রিত চর্চা সাধারণ মানুষের তথ্যের অধিকারকে খর্ব করার পাশাপাশি সাংবাদিকতা পেশার প্রতিও জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করছে।
সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, নিবন্ধনহীন অনলাইন নিউজ পেজ বা আইপি টিভি পরিচালনা করা দণ্ডনীয় অপরাধ। সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ এবং দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, ভুয়া সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে প্রতারণা, মানহানিকর তথ্য প্রচার বা ভুয়া নিউজ পোর্টাল পরিচালনার জন্য কঠোর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। এরপরেও স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারির অভাব ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের ধীরগতির কারণে এসব চক্রের সাহস দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা দাবি তুলেছেন, বিটিআরসি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত এসব অনিবন্ধিত ফেসবুক পেজ শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। একইসাথে, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে গোলাপগঞ্জে তথ্যের অবাধ প্রবাহে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
ভবিষ্যতে পরিবহন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এবং প্রকৃত সাংবাদিকতার মর্যাদা পুনরুদ্ধারে এই ভুয়া নিউজ পেজগুলোর মূলোৎপাটন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। অনিয়ন্ত্রিত এসব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যদি এখনই থামানো না যায়, তবে তা সমাজে বড় ধরনের অস্থিরতা ও আইনি জটিলতা সৃষ্টি করবে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মানেই দায়িত্বহীনতার লাইসেন্স নয়, আর এই সত্যটি গোলাপগঞ্জের তথাকথিত সাংবাদিক নামধারী প্রতারকদের বুঝতে হবে। প্রশাসন যদি দ্রুত এসব অনিবন্ধিত পেজের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তবে সাধারণ মানুষ তথ্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিভ্রান্তির শিকার হতে থাকবে, যা সুস্থ ধারার সাংবাদিকতার বিকাশে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।