সোমবার ৩১ আগস্ট সকাল ১১টায় কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নজরুল বর্ষ উপলক্ষে দেশব্যাপী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচির প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রতিযোগিতার শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন কুলিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ ইয়াসিন খন্দকার। জাতীয় কবির সাহিত্যকর্ম, সংগীত এবং তার দর্শনের সাথে নতুন প্রজন্মকে নিবিড়ভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই মূলত এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের অংশগ্রহণে একটি প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি হয়, যা এই প্রতিযোগিতার গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। কুলিয়ারচরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উপস্থিতিতে উপজেলা মিলনায়তন প্রাঙ্গণ এক সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়। নজরুলের অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী চেতনাকে ধারণ করে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতা মূলত শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল মেধা বিকাশে একটি বড় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে বলে আশা প্রকাশ করেন আয়োজকরা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ভুক্তভোগী ও অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের একাংশ মনে করছেন, বর্তমান সময়ের যান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠ্যপুস্তকের বাইরে সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে পড়ছে, যা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতাকে ব্যাহত করছে। তারা অভিযোগ করেন যে, জাতীয় কবির মতো কালজয়ী সাহিত্যিকদের কর্ম সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মের জ্ঞান সীমিত হয়ে আসছে। এই সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নজরুলের কবিতা আবৃত্তি, গান এবং সাহিত্য আলোচনার সুযোগ পাওয়ায় তাদের মধ্যে এক ধরণের উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও অভিভাবকরা মনে করছেন, কেবল একাডেমিক ফলাফল নয়, বরং একজন শিক্ষার্থীর পরিপূর্ণ বিকাশে এই ধরণের সাংস্কৃতিক উদ্যোগ অপরিহার্য। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত নজরুল সংগীত ও কবিতা আবৃত্তির পরিবেশনাগুলো উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করেছে এবং এটি প্রমাণ করেছে যে, সুযোগ পেলে নতুন প্রজন্ম শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চায় নিজেদের নিয়োজিত করতে সক্ষম। উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মুহাম্মদ মুশফিকুর রহমানের সঞ্চালনায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ তাদের সৃজনশীল সত্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল প্রতিভার যথাযথ বিকাশ ঘটানোই তাদের মূল লক্ষ্য। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ ইয়াসিন খন্দকারসহ উপস্থিত অন্যান্য অতিথিরা নজরুলের সাহিত্য ও সংগীতের দর্শনের ওপর বিস্তারিত আলোকপাত করেন। তারা উল্লেখ করেন যে, জাতীয় কবির আদর্শকে ধারণ করতে পারলে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে আরও বেশি মানবিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই প্রতিযোগিতা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং নজরুলের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ মাসুদুর রহমান এবং প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোঃ মাহফুজুল হক এই আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন যে, বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি এই ধরনের সহ-শিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মননশীলতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরুলের সাহিত্যচর্চাকে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আরও বেগবান করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, কুলিয়ারচরে আয়োজিত এই জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা স্থানীয় শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। জাতীয় কবির অসাম্প্রদায়িক চেতনার চর্চা নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে যে সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, তা ভবিষ্যতে একটি সুশৃঙ্খল ও সংস্কৃতিমনা সমাজ গঠনে সহায়ক হবে। এই আয়োজনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে তা কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরসহ আশেপাশের অঞ্চলে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি করবে। যাতায়াত ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, সুস্থ ধারার সংস্কৃতির প্রতি তাদের প্রবল আগ্রহ রয়েছে। এই ধরনের উদ্যোগ আগামী দিনে জাতীয় পর্যায়ে আরও বড় পরিসরে আয়োজনের দাবি রাখে, যাতে প্রতিটি শিক্ষার্থী নজরুলের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের উন্নয়নে নিজেদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নজরুল চর্চার যে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।