রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর প্রাক্কালে, বাংলাদেশের সামনে পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এক জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যদিও প্রাথমিকভাবে রাশিয়ান ফেডারেশনের রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি কর্পোরেশন রোসাটম (Rosatom) ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি (Spent Nuclear Fuel - SNF) ফেরত নেওয়ার একটি চুক্তি করেছে, তবে এটি সামগ্রিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি স্বল্পমেয়াদী সমাধান মাত্র। দীর্ঘমেয়াদে, বিশেষ করে উচ্চ-মাত্রার তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের (High-Level Radioactive Waste - HLW) নিরাপদ ও স্থায়ী ভূগর্ভস্থ সমাধান খুঁজে বের করা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর জন্যও একটি বড় মাথাব্যথা। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA) এবং পারমাণবিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতিটি দেশকেই তার উৎপাদিত বর্জ্যের চূড়ান্ত ব্যবস্থাপনার দায়ভার বহন করতে হয়।
বাংলাদেশের পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এই চ্যালেঞ্জকে আরও গভীর করেছে ভূগর্ভস্থ সমাধানে (Deep Geological Repository - DGR) বিদ্যমান বহুমুখী জটিলতা। DGR হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি বা উচ্চ-মাত্রার তেজস্ক্রিয় বর্জ্য মাটির বহু গভীরে, সাধারণত কয়েকশো থেকে এক হাজার মিটার নিচে, স্থিতিশীল ভূতাত্ত্বিক গঠনে সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষণ করা হয়। এই ধরনের স্থাপনা নির্মাণে প্রয়োজন হয় অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য— যেমন, শিলাস্তরের অভেদ্যতা, স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকম্প-প্রতিরোধী সক্ষমতা। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, যা সক্রিয় ফল্ট লাইন এবং উচ্চ ভূমিকম্প প্রবণতা অঞ্চলের কাছাকাছি, DGR স্থাপনের জন্য উপযুক্ত স্থান খুঁজে বের করাকে অত্যন্ত দুরূহ করে তুলেছে। উপরন্তু, দেশের উচ্চ জনঘনত্ব এবং ভূগর্ভস্থ পানির উচ্চ স্তর (high water table) ভূগর্ভস্থ বর্জ্য সংরক্ষণের নিরাপত্তা ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়। একটি DGR-এর নকশা, নির্মাণ এবং পরিচালনার জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, প্রচুর আর্থিক সংস্থান এবং বহু দশকের গবেষণা ও উন্নয়নের প্রয়োজন হয়, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি বিশাল বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। এমনকি উন্নত দেশ যেমন ফিনল্যান্ড, সুইডেন এবং কানাডাও এই ধরনের স্থাপনা নির্মাণে কয়েক দশক ধরে গবেষণা করছে এবং এখনো পুরোপুরি বাণিজ্যিক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর একটি সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশল প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি।
রোসাটমের সাথে বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ১০ বছরের ব্যবহৃত জ্বালানি রাশিয়ায় ফেরত নেওয়া হবে, যা বাংলাদেশের উপর থেকে তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমিয়েছে। তবে, এই চুক্তি স্থায়ী সমাধান নয় এবং এর বাইরে উৎপাদিত বর্জ্য বাংলাদেশের নিজেদেরই ব্যবস্থাপনা করতে হবে। ব্যবহৃত জ্বালানি ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়াটিও অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং লজিস্টিক্যালি জটিল, যেখানে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরাপত্তা প্রোটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়। উচ্চ-মাত্রার বর্জ্য ছাড়াও, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের ফলে নিম্ন ও মধ্য-মাত্রার তেজস্ক্রিয় বর্জ্য (Low and Intermediate-Level Radioactive Waste - LILW) উৎপাদিত হয়, যার ব্যবস্থাপনার জন্য স্থানীয়ভাবে নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা গড়ে তোলা অপরিহার্য। বর্তমানে, বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন (BAEC) সীমিত পরিসরে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা রাখলেও, রূপপুর প্রকল্পের বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সামাল দেওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে, বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পে সরাসরি অর্থায়ন করতে কুণ্ঠাবোধ করে, যদি না একটি সুসংগঠিত জাতীয় নীতি, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ থাকে। তাই, বাংলাদেশের বিকল্প ভাবনাগুলো শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত সমাধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, আর্থিক, নিয়ন্ত্রক এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের দিকগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা অত্যাবশ্যক।
বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প ভাবনা হতে পারে প্রাথমিকভাবে একটি কেন্দ্রীয় অন্তর্বর্তীকালীন শুষ্ক সংরক্ষণাগার (Centralized Interim Dry Storage Facility) স্থাপন করা। রূপপুর প্রকল্পের নিজস্ব সাইটে বা দেশের অন্য কোনো উপযুক্ত স্থানে এই ধরনের সুবিধা গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে ব্যবহৃত জ্বালানিকে কয়েক দশক ধরে নিরাপদে সংরক্ষণ করা সম্ভব। এটি DGR নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনের জন্য সময় দেবে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর কারিগরি সহায়তা নিয়ে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। বাংলাদেশের পারমাণবিক জ্বালানি আইন, ২০১২ এবং পারমাণবিক নিরাপত্তা ও বিকিরণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, ১৯৯৭ কে আধুনিক আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতি রেখে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদী ভূগর্ভস্থ সমাধানে পৌঁছানোর জন্য একটি জাতীয় ভূ-তাত্ত্বিক সমীক্ষা পরিচালনা করে দেশের সম্ভাব্য স্থিতিশীল স্থানগুলো চিহ্নিত করা এবং সেখানে গবেষণা শুরু করা এখন সময়ের দাবি। এই প্রক্রিয়ায় দেশের ভূ-তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ সরকার পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে যে অঙ্গীকার করেছে, তার মূল ভিত্তি হলো সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো পারমাণবিক বর্জ্যের নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থাপনা, যার জন্য এখনই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা অপরিহার্য।
| তথ্য বিবরণী | সংখ্যা/সাল | মন্তব্য |
|---|---|---|
| রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা | ২৪০০ মেগাওয়াট | দুটি ইউনিট (প্রতিটি ১২০০ মেগাওয়াট) |
| প্রথম ইউনিট থেকে প্রত্যাশিত বর্জ্য উৎপাদন শুরু | ২০২৫ (আনুমানিক) | বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসার পর |
| প্রতি বছর উৎপাদিত উচ্চ-মাত্রার বর্জ্যের পরিমাণ (আনুমানিক) | ২০-৩০ মেট্রিক টন | প্রতি ইউনিট থেকে (১০০% ক্ষমতা ব্যবহারে) |
| ভূগর্ভস্থ বর্জ্য সমাধানে বৈশ্বিক গড় ব্যয় (প্রারম্ভিক) | ১৫-১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার | বিভিন্ন দেশের প্রকল্প ও ভূতাত্ত্বিক জটিলতা ভেদে |
| রাশিয়ার সাথে বর্জ্য ফেরত চুক্তি | বিদ্যমান | প্রথম ১০ বছরের ব্যবহৃত জ্বালানির জন্য |
| বাংলাদেশের পারমাণবিক জ্বালানি আইন | ২০১২ | পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকনির্দেশনা |
উৎস: বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন (BAEC), আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA), Rosatom প্রতিবেদন, World Nuclear Association.
সুপারিশ
- বাংলাদেশ সরকার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে, 'জাতীয় তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতি' (National Radioactive Waste Management Policy) দ্রুত প্রণয়ন ও কার্যকর করবে। এই নীতিতে উচ্চ-মাত্রার তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণাগার (DGR) স্থান নির্বাচন, উন্নয়ন ও অর্থায়নের একটি দীর্ঘমেয়াদী রোডম্যাপ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এর সাথে সঙ্গতি রেখে, পারমাণবিক জ্বালানি আইন, ২০১২-এর প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি ডেডিকেটেড তহবিল (Dedicated Fund) গঠনের আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হবে, যা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের বিক্রয়লব্ধ অর্থ থেকে পুষ্ট হবে।
- বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন (BAEC)-এর অধীনে 'তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ভূ-তাত্ত্বিক গবেষণা ইনস্টিটিউট' নামে একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা হবে। এই প্রতিষ্ঠানটির মূল কাজ হবে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য দেশীয় মানবসম্পদ তৈরি করা, ভূ-তাত্ত্বিক সমীক্ষা পরিচালনা করে DGR-এর জন্য উপযুক্ত স্থান চিহ্নিতকরণে গবেষণা করা এবং আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA) ও রাশিয়ান ফেডারেশনের রোসাটমের মতো আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা। এই প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ এবং ২০৩০ সাল পর্যন্ত একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে।
- বাংলাদেশ সরকার, বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি টেকসই আর্থিক কাঠামো এবং কারিগরি সহায়তার মডেল নিয়ে আলোচনা শুরু করবে। যদিও তারা সরাসরি DGR নির্মাণে অর্থায়ন নাও করতে পারে, তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালীকরণে তারা সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (BAERA)-কে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরাপত্তা মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতি রেখে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যৌথভাবে সক্ষমতা বৃদ্ধি কর্মসূচি হাতে নেওয়া হবে।