বিশেষ করে অগ্নিকাণ্ডের দিন বাড়ির মালিক মান্না আহমদের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনার সাত দিন পর আদালতে দায়ের করা মামলার এজাহারে বর্ণিত ঘটনার মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য সামনে এসেছে। এতে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা এবং মামলার এজাহারে আসামিদের নির্দিষ্ট ভূমিকার বর্ণনা কীভাবে এলো—তা নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা চলছে।
গত ১৭ আগস্ট ভোরে গোলাপগঞ্জে মান্না আহমদের বসতঘরে আগুন লাগে। ঘটনার দিন মান্না আহমদ বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে জানিয়েছিলেন, ফজরের নামাজ শেষে তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। এ সময় প্রতিবেশী ফয়েজ আহমদ তাকে ডেকে ঘুম থেকে তোলেন। পরে তিনি ঘরের পাশে আগুন দেখতে পান।
সেদিন আগুন কেউ লাগিয়েছে কি না জানতে চাইলে মান্না আহমদ কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেননি। কাউকে আগুন দিতে দেখেছেন কিংবা কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে—এমন নির্দিষ্ট তথ্যও তিনি দেননি। বরং তিনি ধারণা প্রকাশ করেছিলেন, হয়তো পরিকল্পিতভাবে কেউ আগুন লাগিয়ে থাকতে পারে।
কিন্তু ঘটনার সাত দিন পর, গত ২৪ আগস্ট আদালতে দায়ের করা মামলায় উঠে আসে ভিন্ন ও বিস্তারিত একটি বর্ণনা। মামলায় লেকভিউ গার্ডেন সিটি এগ্রো রিসোর্ট লিমিটেডের পরিচালক ও প্রবাসী শরীফ উদ্দিনকে প্রধান আসামি করে মোট ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ১৭ আগস্ট ভোর সাড়ে ৫টার দিকে আসামিরা দুটি নোহা গাড়িতে করে মান্না আহমদের বাড়ির সামনে যায়। এরপর দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তারা বাড়িতে প্রবেশ করে। এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, আসামিদের কয়েকজন ঘরের বিভিন্ন স্থানে পেট্রোলজাতীয় দাহ্য পদার্থ ছড়িয়ে দেন এবং অন্যরা গ্যাস লাইট দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য পাউডার ছুড়ে দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
এজাহারে শুধু আগুন দেওয়ার অভিযোগই নয়, কারা ঘরের কোন অংশে দাহ্য পদার্থ ছড়িয়েছেন, কারা আগুন ধরিয়েছেন এবং কারা আগুন দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পাউডার ব্যবহার করেছেন—তারও বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
এখানেই দেখা দিয়েছে মূল প্রশ্ন। অগ্নিকাণ্ডের সময় যদি বাদী মান্না আহমদ ঘুমিয়ে থাকেন এবং আগুন লাগার পরপরই তিনি কোনো ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে না পারেন, তাহলে পরবর্তী সময়ে আসামিদের প্রত্যেকের এমন সুনির্দিষ্ট ভূমিকার তথ্য কীভাবে এজাহারে এলো—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অগ্নিকাণ্ডের খবর প্রথমে মান্না আহমদের পরিবারকে দেওয়া প্রতিবেশী ফয়েজ আহমদের বক্তব্যেও মামলার এজাহারে বর্ণিত ঘটনার সঙ্গে অসঙ্গতি রয়েছে বলে জানা গেছে। ফয়েজ আহমদ জানান, ফজরের নামাজ পড়ে বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ তিনি মান্না আহমদের ঘরে আগুন দেখতে পান। এরপর দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে ডাকাডাকি করে মান্না আহমদকে ঘুম থেকে তোলেন।
এজাহারে উল্লেখ করা দুটি নোহা গাড়ি ও লোকজনের উপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে ফয়েজ আহমদ বলেন, তিনি যখন আগুন দেখতে পান, তখন ঘটনাস্থলে কোনো নোহা গাড়ি বা কোনো ব্যক্তিকে দেখতে পাননি।
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন ব্রিটিশ আইডিয়াল স্কুলের নাইট গার্ড বিজয় দাস। তিনি জানান, ফয়েজ আহমদের ডাকাডাকি শুনে স্কুল থেকে বের হয়ে মান্না আহমদের বাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখেন। তবে সে সময় ঘটনাস্থলে কোনো নোহা গাড়ি বা লোকজন তার চোখে পড়েনি।
অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে গোলাপগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে যায়। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে সকাল ৬টা ৫৭ মিনিটে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া যায়। এর এক মিনিট পর ৬টা ৫৮ মিনিটে স্টেশন থেকে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা রওনা হন এবং সকাল ৭টা ৫ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। সকাল ৭টা ১৫ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে এবং সকাল ৮টা ২০ মিনিটে পুরোপুরি আগুন নেভানো সম্ভব হয়।গোলাপগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আকরামুল ইসলাম জানান, ঘটনাস্থলে গিয়ে তারা বসতঘরের মাঝের চার-পাঁচটি কক্ষ আগুনে পুড়ে যেতে দেখেছেন। তবে ঘরের সামনের ও পেছনের অংশ অক্ষত ছিল। আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে অগ্নিকাণ্ডের কারণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার আবেদন করলে তদন্তের মাধ্যমে আগুনের প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা যেতে পারে।
এদিকে আদালতে দায়ের করা মামলার এজাহারে মান্না আহমদ অভিযোগ করেছেন, তিনি থানায় মামলা করতে গেলে তা নেওয়া হয়নি। তবে গোলাপগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ছবেদ আলীর বক্তব্য ভিন্ন। তিনি বলেন, থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর একজন কর্মকর্তাকে দিয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান করানো হচ্ছিল। সেই অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগেই মান্না আহমদ আদালত থেকে মামলা করার নির্দেশ নিয়ে আসেন। আদালতের নির্দেশের ভিত্তিতেই মামলা রুজু করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
অগ্নিকাণ্ডের পর মান্না আহমদ ৯ নম্বর পশ্চিম আমুড়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ক্ষতিগ্রস্ততার একটি সনদ নিয়েছেন বলে জানা গেছে। ওই সনদে তার ব্যাংকঋণের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। বিষয়টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ হাছিন আহমদ মিন্টিও নিশ্চিত করেছেন।
ব্যাংকঋণের বিষয়টি সামনে আসার পর অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে আর্থিক কোনো বিষয় জড়িত আছে কি না, তা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমেই পরিষ্কার হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
মামলার প্রধান আসামি প্রবাসী শরীফ উদ্দিন লেকভিউ গার্ডেন সিটি এগ্রো রিসোর্ট লিমিটেডের পরিচালক। মামলার অন্য আসামিদেরও তার প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটি চালুর পর থেকেই শরীফ উদ্দিনের সঙ্গে একটি প্রভাবশালী মহলের বিরোধ চলে আসছে। জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে তাকে বিভিন্ন মামলায় হয়রানি করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে এর আগে গোলাপগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন শরীফ উদ্দিন। একই অভিযোগে তিনি গোলাপগঞ্জ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শরীফ উদ্দিন। তিনি বলেন, মান্না আহমদের বাড়িতে আগুন লাগার খবর শুনে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছেন। বাড়িটি তার প্রকল্পের পাশে হলেও আগুন লাগার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।শরীফ উদ্দিন বলেন, মান্না আহমদ তাকে প্রধান আসামি করে মামলা করেছেন। তার প্রকল্পে যারা কাজ করেন, তাদেরও আসামি করা হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের দিন মান্না আহমদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলেছিলেন, তিনি কাউকে দেখেননি এবং কোনো ব্যক্তির নামও উল্লেখ করেননি। অথচ পরে তার বিরুদ্ধে মামলায় এত বিস্তারিত অভিযোগ আনা হয়েছে। বিষয়টি তাকে হতবাক করেছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, তিনি চান সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসুক।
মামলার বিষয়ে মান্না আহমদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি আদালতে মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, তার বাড়িতে লোকজন আগুন দিয়েছে। এ বিষয়ে সরাসরি গিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
তবে অগ্নিকাণ্ডের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া তার বক্তব্যের সঙ্গে মামলার এজাহারে বর্ণিত তথ্যের পার্থক্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি ওয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে কথা বলবো।’ এরপর তিনি ফোন কেটে দেন। সংবাদ প্রকাশের আগ পর্যন্ত তিনি আর যোগাযোগ করেননি।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হওয়ার পর এখন মূল প্রশ্ন—ঘটনাটি কি সত্যিই পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগ, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো কারণ? অগ্নিকাণ্ডের দিন বাদীর দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে এক সপ্তাহ পর আদালতে দায়ের করা এজাহারের বর্ণনার পার্থক্যের কারণ কী? এজাহারে আসামিদের প্রত্যেকের নির্দিষ্ট ভূমিকার যে বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তার ভিত্তিই বা কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। প্রকৃত ঘটনা জানতে প্রয়োজন ঘটনাস্থলের আলামত পরীক্ষা, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই, সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত। তদন্তে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং মামলার অভিযোগের ভিত্তি কতটা সত্য—তা বেরিয়ে আসতে পারে। ফলে এখন সবার নজর মামলার তদন্তের দিকে।