ইডটেকের ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষা: মেধার উন্মোচন নাকি নতুন বিভাজন? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ইডটেকের ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষা: মেধার উন্মোচন নাকি নতুন বিভাজন?

ফারিহা আফরিন  avatar   
ফারিহা আফরিন
ইডটেকের ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষা: মেধার উন্মোচন নাকি নতুন বিভাজন?
ইডটেকের ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষা: মেধার উন্মোচন নাকি নতুন বিভাজন?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি আইসিটি বিভাগের 'স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১' রূপকল্প বাস্তবায়নের পথে শিক্ষা খাতে ডিজিটাল রূপান্তরের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগতকৃত ইডটেক সমাধ...

সম্প্রতি আইসিটি বিভাগের 'স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১' রূপকল্প বাস্তবায়নের পথে শিক্ষা খাতে ডিজিটাল রূপান্তরের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগতকৃত ইডটেক সমাধানগুলো কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) এর এক প্রতিবেদন অনুসারে, গত পাঁচ বছরে দেশে ইডটেক স্টার্টআপে বিনিয়োগ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা এই খাতের ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু এই দ্রুত বিকাশের মধ্যেই প্রশ্ন উঠছে: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষা কি সত্যিই প্রতিটি শিক্ষার্থীর মেধা উন্মোচনের পথ প্রশস্ত করছে, নাকি এটি সমাজে নতুন করে ডিজিটাল বৈষম্যের জন্ম দিচ্ছে? এই প্রশ্নটি এখন কেবল শিক্ষাবিদদের আলোচনার বিষয় নয়, বরং নীতিনির্ধারক, প্রযুক্তিবিদ এবং অভিভাবকদের জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্যক্তিগতকৃত ইডটেক প্ল্যাটফর্মগুলো শিক্ষার্থীদের শেখার ধরন, গতি এবং আগ্রহ অনুযায়ী কন্টেন্ট সরবরাহ করে। এআই অ্যালগরিদম প্রতিটি শিক্ষার্থীর ডেটা বিশ্লেষণ করে তাদের দুর্বলতা শনাক্ত করে এবং সেই অনুযায়ী অনুশীলনী ও পাঠ্যক্রম প্রস্তাব করে, যা সনাতন শিক্ষা পদ্ধতির একমুখী সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একটি প্ল্যাটফর্ম হয়তো গণিতে দুর্বল একজন শিক্ষার্থীকে পাটিগণিতের নির্দিষ্ট একটি অধ্যায়ে বারবার অনুশীলন করার সুযোগ দিচ্ছে, যেখানে অন্য একজন শিক্ষার্থীকে জ্যামিতির আরও উন্নত পাঠে পরিচালিত করছে। এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং শেখার প্রক্রিয়াকে আরও আনন্দদায়ক করতে সহায়ক। আইসিটি বিভাগ এবং এটুআই (a2i) এর বিভিন্ন ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচির আওতায় এই ধরনের ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষাপদ্ধতিকে গ্রামীণ পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে, যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও উন্নত মানের শিক্ষায় প্রবেশাধিকার পায়। এই উদ্যোগগুলো প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার স্বপ্ন দেখাচ্ছে, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী তাদের নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

তবে, এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার আড়ালে একটি নতুন ধরনের বিভাজন তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষার সুবিধা গ্রহণ করতে হলে শিক্ষার্থীদের উন্নত ইন্টারনেট সংযোগ, স্মার্ট ডিভাইস এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার প্রয়োজন। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়লেও, শহরাঞ্চল ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে ইন্টারনেট গতি ও স্থিতিশীলতার তারতম্য এখনও প্রকট। বিশেষ করে গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট ও ডিভাইসের অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উপরন্তু, অধিকাংশ প্রিমিয়াম ইডটেক প্ল্যাটফর্মের সাবস্ক্রিপশন ফি সাধারণ পরিবারের জন্য ব্যয়বহুল। ফলে, যাদের আর্থিক সক্ষমতা আছে, কেবল তারাই এই উন্নত ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে, আর যারা পারছে না, তারা আরও পিছিয়ে পড়ছে। এটি শিক্ষার সুযোগে অসমতা সৃষ্টি করছে, যা বিদ্যমান সামাজিক-অর্থনৈতিক বিভাজনকে আরও গভীর করতে পারে। বেসিস-এর সদস্যভুক্ত অনেক ইডটেক কোম্পানি যদিও সাশ্রয়ী সমাধান নিয়ে কাজ করছে, কিন্তু সেগুলোর মান এবং সহজলভ্যতা নিয়ে আরও কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

এছাড়াও, ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষার কার্যকারিতা নির্ভর করে কন্টেন্টের গুণগত মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ডেটা সুরক্ষার ওপর। অনেক সময়, দ্রুত বর্ধনশীল ইডটেক বাজারে মানহীন কন্টেন্ট এবং ত্রুটিপূর্ণ অ্যালগরিদম শিক্ষার্থীদের ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে। ডিজিটাল পাঠদানে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকলে, তারা এই প্ল্যাটফর্মগুলোর পূর্ণ সুবিধা শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হতে পারেন। ডেটা সুরক্ষা এবং গোপনীয়তাও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়, কারণ শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত শেখার ডেটা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে অপব্যবহার হতে পারে। বিএইচটিপিএ (BHTPA) এর আওতাধীন হাই-টেক পার্কগুলোতে ইডটেক স্টার্টআপদের জন্য ইনকিউবেশন সুবিধা প্রদান করা হলেও, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ এবং নৈতিক ব্যবহারের বিষয়ে কঠোর নীতিমালা থাকা জরুরি। এটুআই এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যদিও কন্টেন্ট ডেভেলপমেন্টে সহায়তা করছে, কিন্তু একটি জাতীয় মানদণ্ড এবং নিয়মিত নিরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকলে এই সমস্যাগুলো প্রকট হতে পারে। এই সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষা মেধার উন্মোচনের পরিবর্তে একটি নতুন ডিজিটাল বৈষম্য তৈরি করবে, যেখানে কেবল বিশেষ সুবিধাভোগী শিক্ষার্থীরাই এর সুফল পাবে।

সূচক ২০২১ ২০২২ ২০২৩ (প্রাক্কলিত) উৎস
মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (কোটি) ১২.৩ ১৩.৬ ১৪.৯ বিটিআরসি
সক্রিয় ইডটেক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারী (লক্ষ) ৮৫ ১২০ ১৬০ বেসিস
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ডিজিটাল সাক্ষরতা (%) (শহরাঞ্চল) ৬২% ৬৭% ৭১% আইসিটি বিভাগ
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ডিজিটাল সাক্ষরতা (%) (গ্রামীণাঞ্চল) ৩৫% ৪০% ৪৫% আইসিটি বিভাগ
ইডটেক খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি (%) ২০% ২৫% ৩০% বেসিস

উৎস: বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস), এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (আইসিটি বিভাগ) এর সম্মিলিত প্রতিবেদন ও প্রাক্কলন।

সুপারিশ

  • জাতীয় ব্রডব্যান্ড নীতিমালার অধীনে বিটিআরসি-এর মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুলভ মূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করা এবং আইসিটি বিভাগের তত্ত্বাবধানে সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য স্মার্ট ডিভাইস সহজলভ্য করতে একটি বিশেষ তহবিল বা ভর্তুকি প্রকল্প চালু করা।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এটুআই (a2i)-এর যৌথ উদ্যোগে একটি জাতীয় ইডটেক কন্টেন্ট মানদণ্ড (National EdTech Content Standard) এবং ডিজিটাল শিক্ষাবিষয়ক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা, যা শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত ও নিরাপদ ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষা নিশ্চিত করবে।
  • বেসিস (BASIS) এবং বিএইচটিপিএ (BHTPA)-এর মাধ্যমে স্থানীয় ইডটেক স্টার্টআপদের জন্য ইনক্লুসিভ ডিজাইন ও সাশ্রয়ী সমাধান তৈরিতে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ এবং ইনকিউবেশন প্রোগ্রাম চালু করা, যা আইসিটি বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে এবং গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য উদ্ভাবনী সমাধানের পথ প্রশস্ত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারিহা আফরিন

ফারিহা আফরিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ইডটেক (EdTech) ও অনলাইন এডুকেশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator