টেলিকম খাতে দুর্নীতির কালো মেঘ: বিটিআরসির ভূমিকা ও চলমান সংকট | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

টেলিকম খাতে দুর্নীতির কালো মেঘ: বিটিআরসির ভূমিকা ও চলমান সংকট

নাদিয়া ইসলাম  avatar   
নাদিয়া ইসলাম
টেলিকম খাতে দুর্নীতির কালো মেঘ: বিটিআরসির ভূমিকা ও চলমান সংকট
টেলিকম খাতে দুর্নীতির কালো মেঘ: বিটিআরসির ভূমিকা ও চলমান সংকট
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল টেলিকম খাত, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের মুখে পড়েছে...

বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল টেলিকম খাত, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের মুখে পড়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) নিজেই বিভিন্ন তদন্ত, রাজস্ব ফাঁকি এবং লাইসেন্সিং সংক্রান্ত জটিলতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। 'আই নিউজ বিডি'-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই খাতের গভীর ক্ষত, যা সরকার ও সাধারণ গ্রাহক উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অবৈধ ভিওআইপি কার্যক্রম থেকে শুরু করে সিম জালিয়াতি এবং লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার অভিযোগ, সব মিলিয়ে দেশের টেলিকম খাত এক জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে, সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তলব এবং আইসিটি খাতে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি এই খাতের গভীরে প্রোথিত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।

অবৈধ ভিওআইপি (ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল) কার্যক্রম টেলিকম খাতের অন্যতম প্রধান সমস্যা, যা সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। বিটিআরসি নিয়মিতভাবে অবৈধ ভিওআইপি স্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করলেও এই অপতৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে এক অভিযানে ৩০ লাখ টাকার সরঞ্জাম জব্দ করা হয় এবং একজন গ্রেপ্তার হন, যেখানে একটি সিন্ডিকেট দেড় বছর ধরে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মিনিট কল পরিচালনা করে সরকারের প্রায় ৭ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে বলে জানা যায়। এছাড়া, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে বিটিআরসি অবৈধ ভিওআইপি কার্যক্রমে ব্যবহৃত ৮,৬৮২টি সিম শনাক্ত করে চারটি মোবাইল অপারেটরকে মোট ৮.৬৮ কোটি টাকা জরিমানা করেছে, কারণ তারা অবৈধ আন্তর্জাতিক কল টার্মিনেশন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুনেও রাজধানীর নয়াপল্টন ও খিলগাঁও থেকে ১৭,৩৫৪টি সিমসহ বিপুল পরিমাণ ভিওআইপি সরঞ্জাম জব্দ করা হয় এবং দুজনকে আটক করা হয়। এমনকি গ্রামীণফোনকেও অবৈধ ভিওআইপি কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৮.৪০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এই অভিযানগুলো চলমান থাকলেও, অবৈধ ভিওআইপি চক্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

সিম কার্ড জালিয়াতি ও অননুমোদিত নিবন্ধন এই খাতের আরেকটি গুরুতর অনিয়ম। অনেক নাগরিকের অজান্তেই তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবহার করে একাধিক সিম নিবন্ধন করা হচ্ছে, যা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বায়োমেট্রিক জালিয়াতি, অননুমোদিত সিম সক্রিয়করণ এবং সিম প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত অসংখ্য অভিযোগ পেয়েছে। এই সমস্যা মোকাবিলায় বিটিআরসি একজন গ্রাহকের নামে নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০১৭ সালে যেখানে একজন গ্রাহক ১৫টি সিম ব্যবহার করতে পারতেন, তা ২০২২ সালে ১০টিতে নামিয়ে আনা হয়, যা ২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়েছে। এমনকি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এই সংখ্যা আরও কমিয়ে ৫টিতে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে, যা মোবাইল ফোনকেন্দ্রিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। গ্রাহকরা *১৬০০১# ডায়াল করে তাদের নামে নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা যাচাই করতে পারেন। তবে, এই পদক্ষেপগুলো সত্ত্বেও জালিয়াত চক্রের নতুন নতুন কৌশল সিম নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

টেলিকম খাতের গভীরে প্রোথিত দুর্নীতির অভিযোগ আরও বিস্তৃত। ২০২৬ সালের এপ্রিলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিটিআরসির সাবেক তিন চেয়ারম্যানসহ ছয়জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে তলব করে, যা এই সংস্থার অভ্যন্তরে দুর্নীতির ব্যাপকতার ইঙ্গিত দেয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক আলোচনা সভায় বক্তারা টেলিকম খাতে 'নীরবে লুটপাট' এবং বাজারে প্রতিযোগিতা খর্ব করার অভিযোগ তুলে এই খাতের দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানান। একই বছর মে মাসে এক প্রতিবাদ সমাবেশে আইসিটি ও টেলিকম খাতকে 'আওয়ামী সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি' আখ্যায়িত করে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অপসারণ এবং স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির দাবি জানানো হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও আইসিটি খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে, যা বিগত সরকারের চুক্তি ও প্রকল্পগুলো খতিয়ে দেখবে। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে উল্লেখ করেন যে, টেলিকম খাতে লাইসেন্স প্রদানই দুর্নীতির প্রধান উৎস। এর প্রমাণস্বরূপ, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বিটিআরসি মেয়াদোত্তীর্ণ এবং নবায়নের আবেদন না করায় সাতটি পিএসটিএন (পাবলিক সুইচড টেলিফোন নেটওয়ার্ক) লাইসেন্স বাতিল করে। এছাড়া, বিটিআরসির টেলিকম মনিটরিং সিস্টেম (টিএমএস) নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করায় একজন সাংবাদিককে হুমকির ঘটনাও ঘটেছে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এই টিএমএস সিস্টেমের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে ২০২৬ সালের জুনে বিটিআরসি একটি কমিটি গঠন করে এর বাস্তব কার্যকারিতা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে।

রাজস্ব ফাঁকি এবং অব্যবস্থাপনাও এই খাতের বড় সমস্যা। অবৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেটের কারণে প্রতি বছর প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে দেশ। এই ক্ষতি রোধে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) পদ্ধতি পুরোপুরি কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে, এই সিস্টেম বাস্তবায়নেও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে বেসিস (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস) টেন্ডার ছাড়াই সিনেসিস আইটিকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল, যার ফলে বিটিআরসি গুণগত মান ও ব্যয়ভিত্তিক নির্বাচন পদ্ধতিতে সরে আসতে বাধ্য হয়। এছাড়া, বিটিসিএল এবং বিটিআরসির মধ্যে প্রায় ১২০০ কোটি টাকার রাজস্ব বকেয়া নিয়ে বিরোধ রয়েছে, যা নিষ্পত্তি না হওয়ায় সংসদীয় কমিটি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই ধরনের ঘটনাগুলো টেলিকম খাতের আর্থিক স্বচ্ছতা এবং সুশাসনের অভাবকে স্পষ্ট করে তোলে। বিটিআরসির ভবনে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে এনইআইআর কার্যক্রম উদ্বোধনের সময়, যা এই খাতের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে অসন্তোষের ইঙ্গিত দেয়। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি দেশের টেলিকম খাতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমাচ্ছে।

সুপারিশ: বাংলাদেশের টেলিকম খাতের সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। প্রথমত, অবৈধ ভিওআইপি এবং সিম জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ও নিরন্তর অভিযান পরিচালনা করতে হবে এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। মোবাইল অপারেটরদেরও তাদের নেটওয়ার্কে অবৈধ কার্যকলাপ রোধে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে এবং ব্যর্থতার জন্য কঠোর জরিমানার বিধান কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিটিআরসি এবং আইসিটি খাতের সকল লাইসেন্সিং প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে, যেখানে দুর্নীতির কোনো সুযোগ থাকবে না। লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন কমিটি দ্বারা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা উচিত। তৃতীয়ত, দুর্নীতি দমন কমিশনকে বিটিআরসি এবং টেলিকম খাতের সকল অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আইসিটি খাতের দুর্নীতি তদন্তে গঠিত টাস্কফোর্সের সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে এবং এর প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। চতুর্থত, টেলিকম মনিটরিং সিস্টেম (টিএমএস) এবং ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত সিস্টেমগুলোর বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং এর টেন্ডার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ করতে হবে। সর্বশেষ, গ্রাহক স্বার্থ রক্ষায় বিটিআরসিকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে এবং গ্রাহকদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: নাদিয়া ইসলাম

নাদিয়া ইসলাম, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: টেলিকম ও বিটিআরসি (BTRC) ওয়াচ।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator