সম্প্রতি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) বিলুপ্ত করে সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ) ২০২৩ প্রণয়ন বাংলাদেশের ডিজিটাল ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় একটি উল্লেখযোগ্য বাঁক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পরিবর্তন শুধু আইনি কাঠামোরই নয়, বরং সাইবার অপরাধ দমনের কৌশল এবং নাগরিকদের ডিজিটাল অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিরও একটি পুনর্গঠন। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক এই সংশোধনী প্রস্তাবের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহল এবং দেশের অভ্যন্তরে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের উদ্বেগের প্রতি সাড়া দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সুশাসন প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ তার প্রয়োগের শুরু থেকেই ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিল। এই আইনের ২৫, ২৯, ৩১ এবং ৩৭ ধারার মতো কিছু বিধানের অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, যা গণমাধ্যমকর্মী, শিক্ষাবিদ এবং ভিন্নমত পোষণকারীদের বিরুদ্ধে হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে বিভিন্ন ফোরামে আলোচিত হয়। বিশেষত, মানহানির মতো অপরাধকে অজামিনযোগ্য ধারা হিসেবে গণ্য করায় এবং এর কঠোর শাস্তির বিধান থাকায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছিল। এর ফলে, সাইবার অপরাধ দমনের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়ে একটি ভীতির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, যা ডিজিটাল স্পেসে নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করে। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) অধীনে পরিচালিত বিজিডি ই-গভ সার্ট (BGD e-GOV CIRT) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত সাইবার হামলার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রমাণ করে যে কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও সাইবার অপরাধের প্রবণতা কমেনি, বরং এর প্রয়োগ নিয়েই প্রশ্ন উঠেছিল। এই পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর মতো উন্নয়ন সহযোগীরা ডিজিটাল সুশাসন ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় আরও ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছিল, যা তাদের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচির শর্তাবলীতেও পরোক্ষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩-এর প্রবর্তন এই সংকট থেকে উত্তরণের একটি সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। নতুন আইনে মানহানির অপরাধকে জামিনযোগ্য করা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কারাদণ্ডের পরিবর্তে অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, যা আইনের অপব্যবহারের সুযোগ কমাতে সহায়ক হতে পারে। এছাড়া, সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সি গঠন এবং এর ক্ষমতা ও দায়িত্ব সুনির্দিষ্টকরণের মাধ্যমে সাইবার অপরাধ দমনে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই আইনটি প্রযুক্তিগতভাবে আরও উন্নত এবং সাইবার হামলা, ডেটা লঙ্ঘন, এবং সাইবার জালিয়াতির মতো বিষয়গুলো মোকাবিলায় অধিকতর সক্ষম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার এই আইনের মাধ্যমে ডিজিটাল স্পেসে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ একটি আইন প্রণয়নের দিকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ গঠনে আস্থা বৃদ্ধি করবে। বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো সংস্থাগুলো, যারা বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরে সহায়তা করছে, তাদের টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রামগুলোতে সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জোর দিচ্ছে, যা নতুন আইনের বাস্তবায়নে সহায়ক হতে পারে।
তবে, নতুন আইনের সাফল্য নির্ভর করবে এর সঠিক ও সুষ্ঠু বাস্তবায়নের ওপর। শুধু আইন পরিবর্তন করলেই হবে না, এর প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। সাইবার অপরাধের ধরন প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাই সাইবার ফরেনসিক, ডিজিটাল ডেটা বিশ্লেষণ এবং আধুনিক তদন্ত পদ্ধতির ওপর আইন প্রয়োগকারী সংস্থা (যেমন বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট) এবং বিচারকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩-এর কার্যকর প্রয়োগের জন্য একটি শক্তিশালী ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি (NCSA) গঠন ও এর সক্ষমতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। এই এজেন্সিকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে এবং সাইবার হামলা প্রতিরোধ, প্রতিক্রিয়া ও পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক সেরা অনুশীলনগুলো অনুসরণ করতে হবে। উপরন্তু, ডেটা সুরক্ষা এবং গোপনীয়তা (Data Protection and Privacy) সংক্রান্ত একটি স্বতন্ত্র আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এটি নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে আস্থা বাড়াবে। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে ডেটা সুরক্ষা আইনের খসড়া নিয়ে কাজ করছে, যা সাইবার নিরাপত্তা আইনের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
| সাইবার অপরাধের ধরন | ২০২১ সালে রিপোর্টকৃত ঘটনা (আনুমানিক) | ২০২২ সালে রিপোর্টকৃত ঘটনা (আনুমানিক) | ২০২৩ সালে রিপোর্টকৃত ঘটনা (প্রথমার্ধ, আনুমানিক) |
|---|---|---|---|
| ফিশিং ও অনলাইন জালিয়াতি | ৭,৫০০ | ১০,২০০ | ৬,০০০ |
| সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হয়রানি | ১২,০০০ | ১৪,৫০০ | ৮,২০০ |
| ডেটা লঙ্ঘন ও হ্যাকিং | ২,৮০০ | ৩,৫০০ | ২,১০০ |
| সাইবার পর্নোগ্রাফি | ৪,২০০ | ৫,১০০ | ৩,০০০ |
| র্যানসমওয়্যার হামলা | ১,১০০ | ১,৬০০ | ১,০০০ |
উৎস: বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট এবং বিজিডি ই-গভ সার্ট এর প্রাথমিক প্রতিবেদন ও অনুমান।
সুপারিশ
- সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩-এর অধীন বিধিমালা প্রণয়নের সময় সকল অংশীজনের (stakeholders) মতামত গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যতা নিশ্চিত করা। বিশেষত, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে অবশ্যই অস্পষ্ট ধারাগুলো সুনির্দিষ্ট করতে এবং বাক স্বাধীনতার ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব কমাতে একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে নিয়মিত পর্যালোচনা প্রক্রিয়া চালু রাখতে হবে।
- বাংলাদেশ পুলিশ (সাইবার ক্রাইম ইউনিট) এবং জুডিশিয়াল অ্যাকাডেমির মাধ্যমে সাইবার ফরেনসিক, ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, এবং নতুন সাইবার নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগে বিচারকদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। এই প্রশিক্ষণে বিশ্বব্যাংক বা এডিবি-এর মতো উন্নয়ন সহযোগীদের প্রযুক্তিগত সহায়তা ও আন্তর্জাতিক সেরা অনুশীলন অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
- ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি জাতীয় ডিজিটাল সচেতনতা কর্মসূচি (National Digital Awareness Program) চালু করা, যা সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে সাইবার অপরাধের ঝুঁকি, অনলাইন নিরাপত্তা অনুশীলন এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা সম্পর্কে শিক্ষিত করবে, যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের এবং তাদের ডেটার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে।