বিশেষজ্ঞ চোখে ইডটেক (EdTech) ও অনলাইন এডুকেশন: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিশেষজ্ঞ চোখে ইডটেক (EdTech) ও অনলাইন এডুকেশন: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

ফারিহা আফরিন  avatar   
ফারিহা আফরিন
বিশেষজ্ঞ চোখে ইডটেক (EdTech) ও অনলাইন এডুকেশন: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বিশেষজ্ঞ চোখে ইডটেক (EdTech) ও অনলাইন এডুকেশন: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের যৌথ এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিগত তিন বছরে দেশের প্রত্যন্...

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের যৌথ এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিগত তিন বছরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ প্রায় ৪২% শিক্ষার্থী অন্তত একটি অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে একাডেমিক সহায়তা গ্রহণ করেছে। কোভিড-১৯ মহামারীর প্রেক্ষাপটে অনলাইন শিক্ষার প্রসারের পর এই সংখ্যা স্থিতিশীল থাকা এবং প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাওয়া বাংলাদেশে ইডটেক (EdTech) খাতের অপার সম্ভাবনা ও একই সাথে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। এই সমীক্ষা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠার ইঙ্গিত বহন করে।

বাংলাদেশের ইডটেক খাতে এই দ্রুতগতির প্রবৃদ্ধি একদিকে যেমন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে, তেমনি এর গুণগত মান, প্রবেশাধিকার এবং নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নগুলোকেও সামনে নিয়ে আসছে। শহরের সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনপদের শিক্ষার্থীরাও এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিভিন্ন কোর্স ও টিউটোরিয়ালে অংশ নিতে পারছে। তবে, এই সুবিধা সকলের কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে কিনা, তা একটি বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৪ কোটির বেশি হলেও, উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা ও ব্যয় এখনো একটি বড় বাধা, বিশেষ করে দেশের প্রান্তিক এলাকাগুলোতে। এই ডিজিটাল বিভাজন ইডটেক প্ল্যাটফর্মগুলোর পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। অনেক সময় ইন্টারনেট সংযোগের দুর্বলতা বা ডেটা খরচের উচ্চমূল্যের কারণে শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসে নিয়মিত অংশ নিতে পারে না, যা তাদের শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

অনলাইন শিক্ষার প্রসারের সাথে সাথে এর মান নিয়ন্ত্রণ ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ইডটেক প্ল্যাটফর্ম তাদের কন্টেন্টের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে। মানসম্মত ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি এবং তা শিক্ষার্থীদের উপযোগী করে উপস্থাপনের জন্য শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রাম এবং আইসিটি বিভাগ ডিজিটাল কন্টেন্ট ডেভেলপমেন্ট ও শিক্ষক প্রশিক্ষণে বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও, তা এখনো সর্বব্যাপী রূপ লাভ করেনি। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৩০০-এর বেশি ইডটেক স্টার্টআপ সক্রিয় রয়েছে, যাদের অনেকেই উদ্ভাবনী সমাধান নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু এই স্টার্টআপগুলোর জন্য একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম তৈরি করা, যেখানে তারা পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং নিয়ন্ত্রক সমর্থন পাবে, তা এখনো চ্যালেঞ্জিং। মানসম্মত শিক্ষকের অভাব এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাদান পদ্ধতির সাথে শিক্ষকদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া ধীর হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই অনলাইন শিক্ষা তার কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারছে না।

সূচক ২০২০ ২০২২ ২০২৩ পরিবর্তনের হার (২০২০-২০২৩)
ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা (কোটি) ১১.৬ ১৩.২ ১৪.০ ২১%
অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্মে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ (%) ২২% ৩৪% ৪২% ৯১%
ইডটেক স্টার্টআপের সংখ্যা ১৫০+ ২৫০+ ৩০০+ ১০০%
ডিজিটাল সাক্ষরতার হার (১৫-৬০ বছর বয়সীদের মধ্যে) ৩৫% ৪০% ৪৫% ২৮%
সরকারের ডিজিটাল শিক্ষা প্রকল্পে বিনিয়োগ (কোটি টাকা) ৮৫০ ১২০০ ১৫০০ ৭৬%

উৎস: বিটিআরসি, আইসিটি বিভাগ, বিসিসি এবং বিভিন্ন বাজার গবেষণা প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • জাতীয় ইডটেক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) অবিলম্বে একটি সুনির্দিষ্ট 'জাতীয় ইডটেক নীতি ২০২৪' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করুক। এই নীতিতে অনলাইন শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল কন্টেন্ট ডেভেলপমেন্টের মানদণ্ড নির্ধারণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য সুনির্দিষ্ট কাঠামো, ডেটা সুরক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের গোপনীয়তা নিশ্চিত করার জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এবং অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রামের প্রতিনিধিদের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করে এই নীতিটি তৈরি করা উচিত, যাতে এটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হয়।

  • সর্বজনীন ইন্টারনেট অ্যাক্সেস ও সাশ্রয়ী মূল্য নিশ্চিতকরণ: বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) 'ইউনিভার্সাল সার্ভিস অবলিগেশন ফান্ড' (USOF) ব্যবহার করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট অ্যাক্সেস সম্প্রসারণ এবং এর খরচ কমিয়ে আনার জন্য নির্দিষ্ট প্রকল্প হাতে নিক। এর পাশাপাশি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং আইসিটি বিভাগের যৌথ উদ্যোগে 'শিক্ষার্থীদের জন্য সাশ্রয়ী ডেটা প্যাকেজ' চালু করা হোক, যা কেবলমাত্র শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্মগুলোতে ব্যবহারের জন্য প্রযোজ্য হবে। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) তাদের আওতাধীন পার্কগুলোতে ইডটেক স্টার্টআপদের জন্য বিশেষ ইন্টারনেট সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে পারে।

  • ডিজিটাল শিক্ষায় শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও গুণগত মান নিশ্চিতকরণ: আইসিটি বিভাগ এবং অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রাম 'ডিজিটাল শিক্ষকের জন্য জাতীয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি' চালু করুক, যেখানে শিক্ষকদের অনলাইন শিক্ষাদান পদ্ধতি, ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি, মূল্যায়ন কৌশল এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। একই সাথে, BASIS এবং BHTPA-এর সহযোগিতায় একটি স্বাধীন 'ইডটেক কন্টেন্ট সার্টিফিকেশন বোর্ড' গঠন করা হোক, যা অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্মগুলোর কন্টেন্টের গুণগত মান, নির্ভুলতা এবং শিক্ষাগত কার্যকারিতা যাচাই করে একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুযায়ী সনদ প্রদান করবে। এই সনদপ্রাপ্ত প্ল্যাটফর্মগুলোকেই সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে।


✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারিহা আফরিন

ফারিহা আফরিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ইডটেক (EdTech) ও অনলাইন এডুকেশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator