তথ্য অধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

তথ্য অধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ?

সাইফুল বারী  avatar   
সাইফুল বারী
তথ্য অধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ?
তথ্য অধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ এর কার্যকরতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে বাংলাদেশে এক মিশ্র চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষত, তথ্য কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত স...

সম্প্রতি, তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ এর কার্যকরতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে বাংলাদেশে এক মিশ্র চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষত, তথ্য কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থ বছরে তথ্য চেয়ে আবেদনকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও, জনতথ্য কর্মকর্তা কর্তৃক তথ্য প্রদানে গড় বিলম্বের হার আশানুরূপভাবে কমেনি। একই সময়ে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এডিবি, তাদের বাংলাদেশের উপর প্রকাশিত বিভিন্ন রিপোর্টে সুশাসন ও স্বচ্ছতার অভাবকে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা সরাসরি তথ্য অধিকার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সাথে জড়িত। বাংলাদেশ সরকার যদিও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ এবং মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করা এই অগ্রযাত্রার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিধিনিষেধের কারণে গণমাধ্যমের উপর যে পরোক্ষ চাপ তৈরি হয়েছে, তা আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে।

তথ্য অধিকার আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে প্রধান অন্তরায়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো জনতথ্য কর্মকর্তাদের (PIO) প্রশিক্ষণের অভাব এবং আইন সম্পর্কে সাধারণ জনগণের সীমিত সচেতনতা। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, জনতথ্য কর্মকর্তারা আইনটির মূল উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়ার বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন না, যার ফলে তথ্য প্রদানে অনীহা বা দীর্ঘসূত্রিতা পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া, জনতথ্য কমিশন কর্তৃক প্রদত্ত নির্দেশাবলী বা সিদ্ধান্ত পালনে অনেক সময় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এক ধরনের শৈথিল্য দেখা যায়, যা আইনের প্রয়োগকে দুর্বল করে তোলে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, তাদের 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট' রিপোর্টে একাধিকবার উল্লেখ করেছে যে, সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে সরকারি তথ্য প্রবাহে স্বচ্ছতা অপরিহার্য। সংস্থাটি বিশেষভাবে জোর দিয়েছে, সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে তথ্য অধিকার আইনের সঠিক প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, পর্যাপ্ত জনবল এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগের অভাবে তথ্য কমিশন তার পূর্ণ সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করতে পারছে না, যা আইনটির কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে, পরিস্থিতি আরও জটিল। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ (ডিএসএ) প্রণয়নের পর থেকে সাংবাদিকদের মধ্যে এক ধরনের আত্ম-নিয়ন্ত্রণ বা স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের প্রবণতা বেড়েছে। এই আইনের অধীনে দায়ের করা অনেক মামলা সাংবাদিকতা পেশার প্রতি হুমকি সৃষ্টি করেছে এবং স্বাধীন সংবাদ পরিবেশনার পথকে সংকুচিত করেছে। বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে এই আইনের অপপ্রয়োগ রোধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বললেও, মাঠ পর্যায়ে এর প্রভাব এখনো স্পষ্ট। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) তাদের 'কান্ট্রি পার্টনারশিপ স্ট্র্যাটেজি ফর বাংলাদেশ'-এ সুশাসন, জবাবদিহি এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার উপর গুরুত্বারোপ করেছে, যেখানে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী গণমাধ্যমকে অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এডিবির মতে, গণমাধ্যম শুধুমাত্র তথ্য সরবরাহকারী নয়, বরং এটি সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এবং জনমত গঠনে একটি কার্যকর হাতিয়ার। কিন্তু, বর্তমানে যে আইনি কাঠামো এবং সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিদ্যমান, তাতে গণমাধ্যমের পক্ষে নির্ভয়ে ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং সার্বিক উন্নয়নকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তথ্য প্রাপ্তির অধিকার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একে অপরের পরিপূরক; একটি ব্যাহত হলে অন্যটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এবং এর সম্মিলিত প্রভাব দেশের সুশাসনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

সাল মোট আবেদন তথ্য প্রদানে বিলম্ব (শতাংশ) আপিল আবেদন নিষ্পত্তির হার (শতাংশ)
২০২১-২২ ১০,৪৫০ ৩২% ৩৫০ ৯২%
২০২২-২৩ ১১,৮২০ ২৭% ৩৮০ ৯৪%
২০২৩-২৪ (প্রাক্কলিত) ১৩,১০০ ২৫% ৪১০ ৯৫%

উৎস: তথ্য কমিশন, বাংলাদেশ (বার্ষিক প্রতিবেদন ও প্রাক্কলিত তথ্য)।

সুপারিশ

  • তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ এর কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য তথ্য কমিশনকে আরও শক্তিশালী করা এবং এর ক্ষমতা ও এখতিয়ার বৃদ্ধি করা আবশ্যক। এজন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (যেমন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়) এবং বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক কমিশনের বাজেট ও জনবল বৃদ্ধি করে জনতথ্য কর্মকর্তাদের নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা আইন সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান লাভ করেন এবং তথ্য প্রদানে স্বচ্ছতা ও দ্রুততা নিশ্চিত হয়।
  • গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ (ডিএসএ) এর বিতর্কিত ধারাগুলো অবিলম্বে পর্যালোচনা ও সংশোধন করা উচিত, অথবা একটি নতুন আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন যা সাংবাদিকতা পেশাকে সুরক্ষা দেবে এবং বাকস্বাধীনতাকে খর্ব করবে না। এ বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
  • গণমাধ্যমকর্মী এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে তথ্য অধিকার আইন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়ক সচেতনতা বাড়াতে ব্যাপক প্রচার ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যৌথভাবে কর্মশালা, সেমিনার ও জনসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন আয়োজন করতে পারে, যাতে নাগরিকরা তাদের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার সম্পর্কে অবগত হন এবং গণমাধ্যমকর্মীরা নির্ভয়ে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাইফুল বারী

সাইফুল বারী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: তথ্য অধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator