সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাংকের অভিবাসন ও উন্নয়ন প্রতিবেদন (Migration and Development Brief) ২০২৩ অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ পেশাজীবীদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ উন্নত দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছে। এই প্রবণতা কেবল সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলছে। বিশেষত, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং উচ্চশিক্ষার মতো মূল খাতগুলো থেকে মেধাবীদের এই ক্রমাগত বহির্গমন বাংলাদেশের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় একটি গভীর সংকট তৈরি করছে, যা আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের ‘ব্রেন ড্রেন’ বা মেধা পাচারের মূল কারণগুলো বহুমুখী এবং গভীর শিকড়যুক্ত। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা এবং অর্থায়নের অভাব একটি বড় কারণ। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) যদিও উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন ও গবেষণায় উৎসাহিত করার জন্য কাজ করে, তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আধুনিক ল্যাবরেটরি, উন্নত গবেষণা সরঞ্জাম এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা জার্নাল ও ডেটাবেসগুলোতে প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতা মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এছাড়া, উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব এবং মেধার সঠিক মূল্যায়ন না হওয়াও একটি প্রধান অনুঘটক। উদাহরণস্বরূপ, একজন পিএইচডি ধারী গবেষকের জন্য দেশে গবেষণা-ভিত্তিক ক্যারিয়ারের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত, যা তাদের উন্নত দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়ে আকৃষ্ট করে। দেশের অভ্যন্তরে উচ্চ বেতন, সামাজিক সম্মান এবং পেশাগত উন্নতির সুযোগের অভাব অনেক মেধাবী তরুণকে বিদেশে স্থায়ী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে। এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন দেশের গবেষণা ও উন্নয়ন খাতকে দুর্বল করছে, তেমনি নতুন উদ্ভাবন এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
মেধা পাচারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। যখন দেশের সেরা চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তিবিদরা বিদেশে চলে যান, তখন দেশের স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ব্যাহত হয়। এই মেধাবীরা বিদেশে যে অর্থ উপার্জন করেন, তার একটি অংশ রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে এলেও, তাদের মেধা ও শ্রমের মূল্য এর চেয়ে অনেক বেশি। একজন দক্ষ পেশাজীবীর অনুপস্থিতি দেশের উৎপাদনশীলতা এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর দেশের জনশক্তিকে দক্ষ করে তোলার জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কর্মসূচি পরিচালনা করছে। কিন্তু এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ জনশক্তির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যদি উপযুক্ত সুযোগের অভাবে দেশ ত্যাগ করে, তবে NSDA এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের বিনিয়োগ ও প্রচেষ্টা আংশিকভাবে ব্যর্থ হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, Skills for Employment Investment Program (SEIP) এর অধীনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনেক তরুণ বিদেশে উন্নত জীবনের সন্ধানে পাড়ি জমাচ্ছে, যা দেশের অভ্যন্তরে দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি তৈরি করছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এবং চীনের মতো দেশগুলো তাদের বিশাল জনসংখ্যার একাংশকে বিদেশে পাঠিয়ে রেমিট্যান্স অর্জন করলেও, একই সাথে দেশীয় শিল্পে বিনিয়োগ এবং মেধা ধরে রাখার জন্য শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করেছে। তারা মেধা পাচারকে 'ব্রেন গেইন' বা 'ব্রেন সার্কুলেশন'-এ রূপান্তরের কৌশল অবলম্বন করেছে, যেখানে প্রবাসীরা দেশের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, এই প্রবাসী সংযোগ এখনো ততটা শক্তিশালী নয় এবং মেধা ধরে রাখার নীতিগুলো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) যদিও শিক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে, তবে মেধা পাচারের সুনির্দিষ্ট তথ্য এবং এর কারণ ও প্রভাব নিয়ে গভীর বিশ্লেষণের অভাব রয়েছে, যা কার্যকর নীতি প্রণয়নে বাধা সৃষ্টি করে।
| বছর | বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা (আনুমানিক) | উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন পেশাজীবী হিসেবে অভিবাসন (আনুমানিক) | মোট বৈশ্বিক রেমিট্যান্স প্রাপ্তি (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) |
|---|---|---|---|
| ২০১৯ | ৬২,০০০ | ৮,৫০০ | ১৮.৩৫ |
| ২০২০ | ৫৯,০০০ | ৭,২০০ | ২১.৭৫ |
| ২০২১ | ৭৩,০০০ | ৯,১০০ | ২২.০৭ |
| ২০২২ | ৮০,০০০ | ১০,৫০০ | ২১.২৯ |
| ২০২৩ | ৮৫,০০০ | ১১,২০০ | ২৩.৫০ |
উৎস: বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS), বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিশ্বব্যাংকের অভিবাসন ও উন্নয়ন প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত উপাত্তের ভিত্তিতে (আনুমানিক)
সুপারিশ
- বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) কে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা ও উদ্ভাবনে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন তহবিল' গঠন করতে হবে। এই তহবিলের অধীনে, পিএইচডি ও পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপের সংখ্যা ও আর্থিক সুবিধা দ্বিগুণ করা আবশ্যক এবং গবেষণার মান মূল্যায়নে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
- জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে যৌথভাবে শিল্প খাতের সাথে নিবিড় সমন্বয় সাধন করে উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প স্থাপন এবং দেশীয় উদ্ভাবকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ (যেমন, স্টার্টআপ ফান্ড, কর অবকাশ, সহজ শর্তে ঋণ) চালু করতে হবে। এক্ষেত্রে 'দক্ষ জনশক্তি ধরে রাখা নীতি-২০২৫' (Talent Retention Policy 2025) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন অপরিহার্য, যা মেধাবীদের দেশে কাজ করার জন্য আকর্ষণীয় সুযোগ তৈরি করবে।
- Skills for Employment Investment Program (SEIP) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে শিল্প-ভিত্তিক কারিকুলাম প্রণয়ন, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং প্রশিক্ষিত কর্মীদের জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে কার্যকর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট সংখ্যক নবীন গ্র্যাজুয়েট ও কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী নিয়োগে বাধ্যতামূলক কোটা বা প্রণোদনা প্রদান করা যেতে পারে, যা 'কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন' এর অধীনে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।