সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) প্রকাশিত এক প্রাথমিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) মাত্র ০.৪% গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) ব্যয় হয়, যা দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। যেখানে প্রতিবেশী দেশ ভারত তাদের জিডিপির প্রায় ০.৭% এবং দক্ষিণ কোরিয়া ৪.৬% R&D খাতে ব্যয় করে, সেখানে বাংলাদেশের এই চিত্র বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচকে আমাদের অবস্থানকে আরও পিছিয়ে দিচ্ছে। এই পরিসংখ্যান শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের উদ্ভাবনী সক্ষমতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের পথে এক বিশাল প্রতিবন্ধকতার ইঙ্গিত দেয়, যার অজানা দিকগুলো মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণা তহবিলের অপ্রতুলতা এবং বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন দীর্ঘদিনের। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) প্রতি বছর গবেষণা অনুদান বরাদ্দ করলেও, এর সিংহভাগই ব্যয় হয় মৌলিক গবেষণায়, যার সঙ্গে শিল্প খাতের সরাসরি সংযোগ প্রায়শই অনুপস্থিত। উদাহরণস্বরূপ, গত অর্থবছর (২০২২-২৩) এ UGC পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ১২০ কোটি টাকা গবেষণা অনুদান হিসেবে বরাদ্দ করেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ১৫% বেশি। তবে, এই বিনিয়োগের ফলস্বরূপ কয়টি নতুন পেটেন্ট নিবন্ধিত হয়েছে, কয়টি প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে, অথবা কয়টি উদ্ভাবন শিল্প উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রায়শই অধরা থাকে। গবেষণার মান, প্রাসঙ্গিকতা এবং প্রায়োগিক দিক নিয়ে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে অনেক গবেষণা প্রতিবেদন কেবল প্রকাশনাতেই সীমাবদ্ধ থাকে, যা দেশের প্রকৃত R&D অগ্রগতির জন্য তেমন ফলপ্রসূ হয় না। উন্নত ল্যাব সুবিধা, আধুনিক সরঞ্জাম এবং উচ্চ প্রশিক্ষিত গবেষকের অভাব এই খাতের মূল দুর্বলতাগুলোর মধ্যে অন্যতম, যা বিশেষত বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদগুলোতে প্রকট। এছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা সংস্কৃতিতে প্রায়শই আন্তঃবিভাগীয় বা আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার অভাব দেখা যায়, যা সমন্বিত ও বৃহৎ পরিসরের গবেষণা উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করে।
অন্যদিকে, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন খাতে R&D-এর গুরুত্ব প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করলেও, উদ্ভাবন ও প্রায়োগিক গবেষণায় তাদের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে সীমিত। শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী নতুন প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনে R&D-এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। উদাহরণস্বরূপ, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং বায়োটেকনোলজির মতো উদীয়মান ক্ষেত্রগুলোতে উচ্চ-দক্ষতা সম্পন্ন জনবল তৈরি করা অপরিহার্য। কিন্তু, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠ্যক্রম প্রায়শই সেকেলে এবং শিল্প খাতের বর্তমান R&D চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে SEIP (Skills for Employment Investment Program) বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ প্রদান করলেও, সেগুলোর খুব কমই সরাসরি R&D বা উদ্ভাবন-কেন্দ্রিক। NSDA যদিও দক্ষতার মান নির্ধারণ করে, কিন্তু R&D-এর জন্য প্রয়োজনীয় 'উচ্চতর উদ্ভাবনী দক্ষতা' (Higher Order Innovation Skills) সংজ্ঞায়িত করা এবং তার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে, দেশের শিল্প খাতগুলো প্রায়শই বিদেশী প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞের উপর নির্ভরশীল থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের নিজস্ব উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে খর্ব করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত R&D নীতি এবং প্রায়োগিক গবেষণায় বিনিয়োগের অভাব দৃশ্যমান, যা মাঠপর্যায়ে দক্ষ উদ্ভাবকের সংখ্যা বৃদ্ধিতে বাধা দিচ্ছে।
R&D খাতের এই অদেখা দিকগুলোর মূলে রয়েছে একটি সমন্বিত জাতীয় R&D নীতির অভাব এবং কার্যকর ডেটা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। BANBEIS শিক্ষা সংক্রান্ত ব্যাপক তথ্য সংগ্রহ করলেও, R&D বিনিয়োগ, গবেষণা আউটপুট, পেটেন্ট ফাইল করা বা প্রযুক্তি স্থানান্তরের মতো নির্দিষ্ট ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জন্য একটি সুসংহত প্ল্যাটফর্মের অভাব রয়েছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা শিল্প খাতের নিজস্ব R&D কার্যক্রমের তথ্য প্রায়শই সরকারি ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত হয় না, ফলে দেশের সামগ্রিক R&D চিত্র অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই তথ্যের ঘাটতি নীতি নির্ধারকদের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে কঠিন করে তোলে। এছাড়া, R&D-তে ব্যক্তিগত খাতের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জন্য কার্যকর প্রণোদনা নীতির অভাবও পরিলক্ষিত হয়। R&D-কে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে এর প্রসার ঘটানো অত্যন্ত জরুরি। উদ্ভাবনী সংস্কৃতি গড়ে তুলতে স্কুল পর্যায় থেকেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ানো এবং তাদের হাতে-কলমে গবেষণার সুযোগ করে দেওয়া প্রয়োজন। দেশের মেধাবী গবেষকদের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য বিদেশে গমন একটি সাধারণ প্রবণতা, যা 'ব্রেইন ড্রেন' নামে পরিচিত। এই মেধাবীদের দেশে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রেও R&D খাতের দুর্বলতা একটি বড় কারণ।
| সূচক | সংখ্যা/শতাংশ | মন্তব্য |
|---|---|---|
| মোট দেশজ উৎপাদনে (GDP) R&D ব্যয় | ০.৪% (প্রাক্কলিত) | BANBEIS এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, যা বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে অনেক কম। |
| UGC কর্তৃক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা অনুদান | ১২২ কোটি টাকা | পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১৫% বৃদ্ধি পেলেও, পেটেন্ট ও প্রায়োগিক উদ্ভাবনে প্রভাব সীমিত। |
| কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় R&D-সংশ্লিষ্ট কোর্স | ১৫-২০% (আনুমানিক) | কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এর অধীনে পরিচালিত মোট কোর্সের মধ্যে সরাসরি R&D-কেন্দ্রিক কোর্সের সংখ্যা। |
| NSDA সনদপ্রাপ্ত R&D-সংশ্লিষ্ট উচ্চ-দক্ষতা সম্পন্ন জনবল | < ৫০০০ জন | বার্ষিক (প্রাক্কলিত), যা শিল্প খাতের চাহিদা পূরণে অপ্রতুল। |
| SEIP এর R&D-কেন্দ্রিক প্রশিক্ষণ প্রকল্পের সংখ্যা | < ১০টি | প্রকল্পের মোট সংখ্যার তুলনায় R&D-এর উপর সরাসরি ফোকাস করা প্রকল্পের সংখ্যা। |
| বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেটেন্ট আবেদন (বার্ষিক গড়) | < ৫০টি | UGC-এর তথ্য অনুযায়ী, যা গবেষণার পরিমাণের তুলনায় নগণ্য। |
উৎস: বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) এর প্রাথমিক প্রতিবেদন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এর বার্ষিক প্রতিবেদন, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এর প্রকাশনা থেকে সংগৃহীত ও প্রাক্কলিত।
সুপারিশ
- বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) কে অবিলম্বে 'জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন নীতি, ২০২৪' (যদি এমন কোনো নীতি প্রণয়নের প্রক্রিয়া থাকে) এর অধীনে প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বাধ্যতামূলক গবেষণা আউটপুট লক্ষ্যমাত্রা (যেমন – নির্দিষ্ট সংখ্যক আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা, পেটেন্ট আবেদন, এবং শিল্প-সম্পর্কিত প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি) নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি, শিল্প-গবেষণা অংশীদারিত্বের জন্য বার্ষিক গবেষণা বাজেটের ন্যূনতম ২০% তহবিল বরাদ্দ করতে হবে এবং এই অর্থ শুধুমাত্র প্রায়োগিক গবেষণায় ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
- জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে যৌথভাবে 'জাতীয় কারিগরি গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্র' প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই কেন্দ্র SEIP (Skills for Employment Investment Program)-এর সহায়তায় শিল্প খাতের (যেমন – আইটি, বায়োটেকনোলজি, নবায়নযোগ্য শক্তি) চাহিদা অনুযায়ী উচ্চ-দক্ষতা সম্পন্ন গবেষণা সহযোগী ও প্রযুক্তিবিদ তৈরির জন্য বিশেষায়িত 'অ্যাডভান্সড R&D স্কিলস প্রশিক্ষণ কর্মসূচি' চালু করবে, যেখানে আধুনিক ল্যাব সুবিধা ও শিল্প বিশেষজ্ঞদের সরাসরি সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা হবে।
- বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) কে একটি সমন্বিত 'জাতীয় R&D ডেটা পোর্টাল' তৈরি করতে হবে, যা 'জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতি, ২০১৬' এর আলোকে দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্প খাতের R&D ব্যয়, জনবল, উদ্ভাবনের সংখ্যা (পেটেন্ট, প্রোটোটাইপ) এবং বাণিজ্যিকীকরণের তথ্য নিয়মিত ও বাধ্যতামূলকভাবে হালনাগাদ করবে। এই পোর্টাল R&D বিনিয়োগের প্রভাব মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যত নীতি প্রণয়নে একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার হিসেবে কাজ করবে।