বিশেষজ্ঞ চোখে শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিশেষজ্ঞ চোখে শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

জাহাঙ্গীর আলম  avatar   
জাহাঙ্গীর আলম
বিশেষজ্ঞ চোখে শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বিশেষজ্ঞ চোখে শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বাংলাদেশ শিপবিল্ডিং কর্পোরেশন (বিএসসি) থেকে মরিশাসের জন্য দুটি বৃহৎ সমুদ্রগামী জাহাজ নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর, দেশের শিপবিল্ডিং শিল্প ন...

সম্প্রতি বাংলাদেশ শিপবিল্ডিং কর্পোরেশন (বিএসসি) থেকে মরিশাসের জন্য দুটি বৃহৎ সমুদ্রগামী জাহাজ নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর, দেশের শিপবিল্ডিং শিল্প নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই অর্জন একদিকে যেমন দেশের সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে, অন্যদিকে একই খাতের জাহাজ ভাঙা উপখাত নিয়ে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) উদ্বেগগুলোও পুনরায় আলোচনায় এসেছে। বিশ্বজুড়ে যখন পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের এই দুটি শিল্প উপখাত, শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা, এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। শিপবিল্ডিং শিল্প দেশের জন্য সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন করছে, যেখানে জাহাজ ভাঙা শিল্প পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ ও শ্রমিক নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রায়শই সমালোচিত হচ্ছে। এই দুটি উপখাতকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা জরুরি, যেখানে তাদের অর্থনৈতিক গুরুত্ব, পরিবেশগত প্রভাব এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা সমানভাবে বিবেচিত হবে।

বাংলাদেশের শিপবিল্ডিং শিল্প বিগত দেড় দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি, ডেনমার্ক, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড, কেনিয়া, উগান্ডা, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছোট ও মাঝারি আকারের কার্গো ভেসেল, কন্টেইনার ফিডার, প্যাসেঞ্জার ভেসেল, ফিশিং ট্রলার, টাগবোট এবং ফেরি রপ্তানি করে বাংলাদেশ তার সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। বাংলাদেশের সস্তা ও দক্ষ শ্রমশক্তি, তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয় এবং প্রকৌশলগত জ্ঞান এই শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে এনেছে। বিশেষ করে, স্থানীয় শিপইয়ার্ডগুলো এখন ক্রমান্বয়ে আরও জটিল ও উচ্চ প্রযুক্তির জাহাজ নির্মাণে সক্ষমতা অর্জন করছে। সরকারের রপ্তানি নীতিমালায় এই শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক রপ্তানি প্রণোদনা ও ঋণ সুবিধা প্রদান এই খাতের বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এই শিল্প শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনই করছে না, বরং ভারী প্রকৌশল শিল্পে স্থানীয় জ্ঞানের বিকাশ এবং হাজার হাজার দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও অবদান রাখছে। তবে, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার জন্য ডিজাইন ও প্রযুক্তির আধুনিকীকরণ, উচ্চমানের কাঁচামাল ব্যবহার এবং সময়োপযোগী ডেলিভারি নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।

অন্যদিকে, জাহাজ ভাঙা শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা দেশের ইস্পাত শিল্পের কাঁচামালের প্রায় ৪৫-৫০ শতাংশ যোগান দেয় এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। তবে, এই শিল্পের উজ্জ্বল অর্থনৈতিক দিকটির আড়ালে রয়েছে পরিবেশগত বিপর্যয় এবং শ্রমিক নিরাপত্তার ভয়াবহ চিত্র। আন্তর্জাতিক আইন ও মানদণ্ড অনুসরণ না করে জাহাজ ভাঙার কারণে অ্যাজবেস্টস, পলক্লোরিনেটেড বাইফেনাইলস (PCBs), ভারী ধাতু (সীসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম), তেল ও লুব্রিক্যান্টের মতো বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি মাটি ও সমুদ্রে মিশে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। শ্রমিকরা প্রায়শই পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) ছাড়াই কাজ করে, যার ফলে মারাত্মক দুর্ঘটনা, আগুন লাগা এবং বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসার কারণে অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঘটনা নিয়মিত ঘটে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) বারবার এই শিল্পের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং টেকসই জাহাজ রিসাইক্লিং অনুশীলনের জন্য কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছে, যা অনেক সময়ই কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং অ্যাক্ট, ২০১৮ এবং শিপ রিসাইক্লিং রুলস, ২০১১-এর পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ এখনো অধরা, যা এই শিল্পের টেকসই উন্নয়নে প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে।

শিপবিল্ডিং শিল্পকে ঘিরে একটি প্রচলিত মিথ হলো, এটি কেবল বিশাল বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমেই সফল হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, স্থানীয় উদ্যোক্তা এবং প্রকৌশলীরাও সীমিত সম্পদ নিয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের জাহাজ নির্মাণে সক্ষম। প্রয়োজন শুধু সরকারের ধারাবাহিক নীতিগত সমর্থন, গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। অন্যদিকে, জাহাজ ভাঙা শিল্প নিয়ে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, এটি অপরিহার্যভাবে একটি 'নোংরা' শিল্প এবং পরিবেশগত ক্ষতি এড়ানো সম্ভব নয়। এই ধারণাটি বাস্তবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। 'গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং' বা পরিবেশবান্ধব জাহাজ ভাঙা পদ্ধতি অনুসরণ করে বিষাক্ত বর্জ্যের নিরাপদ অপসারণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদানের সর্বোচ্চ পুনরুদ্ধার এবং শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব। এই প্রক্রিয়ায় প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশি হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি পরিবেশের সুরক্ষা, সম্পদ সংরক্ষণ এবং মানব স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটিয়ে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে। বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নে, পরিবেশবান্ধব জাহাজ ভাঙার প্রতি ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা এবং একই সাথে একটি সুযোগও বটে। এই দুটি শিল্পের টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে সত্যকে গ্রহণ করে মিথগুলো দূর করা অত্যাবশ্যক।

সুপারিশ

  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়-কে শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প খাতের ত্রৈমাসিক তথ্য প্রকাশনা বাধ্যতামূলক করতে হবে — স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে একটি পাবলিক ড্যাশবোর্ড চালু করুন।
  • World Bank কর্তৃক শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প খাতে বিনিয়োগ নীতিমালা পুনর্মূল্যায়ন করে বেসরকারি অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে হবে — একক নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রতিষ্ঠা জরুরি।
  • ADB কর্তৃক শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প-এ বিশেষায়িত দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে — ২০২৭ সালের মধ্যে ১০,০০০ দক্ষ পেশাদার তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করুন।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহাঙ্গীর আলম

জাহাঙ্গীর আলম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator
বাংলাদেশের শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্পের তুলনামূলক চিত্র
ক্ষেত্র সূচক ২০১৯ সাল ২০২০ সাল ২০২১ সাল ২০২২ সাল ২০২৩ সাল (প্রাক্কলিত)
শিপবিল্ডিং রপ্তানি মূল্য (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ২০.৫ ১৮.০ ২৫.৩ ৩০.২ ৩৫.০
নির্মিত জাহাজের সংখ্যা (রপ্তানি) ৫ ৪ ৭ ৮ ১০
জাহাজ ভাঙা শিল্প মোট জাহাজ ভাঙা (সংখ্যা)