গত অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত গ্রীষ্ম মৌসুমে দৈনিক প্রায় ২,০০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ ঘাটতি লক্ষ্য করা গিয়েছিল, যার প্রধান কারণ ছিল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে তীব্র ডলার সংকট। এই সংকট শুধু জনজীবনে লোডশেডিংয়ের দুর্ভোগ বাড়ায়নি, বরং শিল্প উৎপাদনকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি ক্রয়ের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় বিদ্যুতের জন্য গ্যাসের সরবরাহ কমেছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গ্যাসভিত্তিক, যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখন আমদানি করা এলএনজির উপর নির্ভরশীল। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় ২০১০ সালের পর থেকে এলএনজি আমদানির প্রয়োজনীয়তা বাড়তে থাকে এবং ২০১৯ সালে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (FSRU) চালুর পর এই নির্ভরশীলতা আরও প্রকট হয়। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গত দুই বছরে এলএনজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বাংলাদেশ সরকারের উপর আর্থিক চাপ বহুগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি ক্রয়ের পরিমাণ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে, যা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর জ্বালানি আমদানির এই চাপকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই চাপ সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা দেশের শিল্প খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়।
এলএনজি আমদানিনির্ভরতার এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসার জন্য দীর্ঘমেয়াদী এবং বহুমুখী কৌশল অবলম্বন করা জরুরি। দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রমে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা এর অন্যতম প্রধান উপায়। বিগত দশকে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কারে এবং বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধিতে পর্যাপ্ত মনোযোগ না দেওয়ায় আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। বাপেক্স-এর মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন। একই সাথে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি যেমন সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধিতে ব্যাপক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন অপরিহার্য। বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এর ব্যবহার এখনও মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০ শতাংশের নিচে। এই খাতে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে এলএনজি আমদানির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব, যা ডলার সাশ্রয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জ্বালানি খাতে ভর্তুকি হ্রাস করে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যকে যৌক্তিক পর্যায়ে আনাও অপরিহার্য। যদিও এটি স্বল্পমেয়াদে জনজীবনে কিছুটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং অপচয় রোধে সহায়ক হবে। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর মাধ্যমে বিদ্যুতের দাম কয়েক দফায় সমন্বয় করেছে, যা ভর্তুকির বোঝা কমাতে কিছুটা সহায়ক হয়েছে। তবে, এই সমন্বয় প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও বাজারমুখী করতে হবে। আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে বিদ্যুৎ আমদানি এবং ক্রস-বর্ডার গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা যেতে পারে, যা বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহকে আরও বৈচিত্র্যময় ও স্থিতিশীল করতে সাহায্য করবে।
| সাল | এলএনজি আমদানি (বিলিয়ন ঘনফুট) | মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন (গিগাওয়াট-ঘণ্টা) | নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন (গিগাওয়াট-ঘণ্টা) | ডলারের বিনিময় হার (BDT প্রতি USD) |
|---|---|---|---|---|
| ২০১৮-১৯ | ১০০.২ | ৮৩,৮০০ | ৬০০ | ৮৪.৫০ |
| ২০১৯-২০ | ১৪৫.৫ | ৮৭,৪৫০ | ৭০০ | ৮৪.৮০ |
| ২০২০-২১ | ১৬০.১ | ৯৬,২০০ | ৭৫০ | ৮৫.৫০ |
| ২০২১-২২ | ১৫২.০ | ১০৩,১০০ | ৮০০ | ৯২.৫০ |
| ২০২২-২৩ (প্রাক্কলিত) | ১২০.০ | ১০৮,৫০০ | ৯৫০ | ১০৮.০০ |
উৎস: বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), পেট্রোবাংলা, বাংলাদেশ ব্যাংক, এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)
সুপারিশ
- দেশের অভ্যন্তরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্স-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে (IOCs) গভীর সমুদ্রে (Deep Sea Block) অনুসন্ধানের জন্য পেট্রোবাংলা কর্তৃক নতুন উৎপাদন-বণ্টন চুক্তি (PSC) চূড়ান্ত করে দ্রুত দরপত্র আহ্বান করা।
- বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক "জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০০৮" এর অধীনে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা (২০৪০ সাল নাগাদ ৪০% বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে) অর্জনের জন্য সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের বাস্তবায়নে ত্বরান্বিত করা এবং World Bank ও ADB-এর আর্থিক সহায়তায় গ্রিড আধুনিকীকরণ ও স্টোরেজ প্রযুক্তি স্থাপনে গুরুত্বারোপ করা।
- বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আনতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ কর্তৃক স্বল্পমেয়াদী ও মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন করা, যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা ও পরমাণু বিদ্যুতের অংশীদারিত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য সমন্বয় প্রক্রিয়াকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর মাধ্যমে নিয়মিত ও স্বচ্ছ করা।