এলএনজি নির্ভরতা: বাংলাদেশের বিদ্যুৎ গ্রিডের নতুন দুর্বলতা ও টেকসই সমাধানের খোঁজে | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

এলএনজি নির্ভরতা: বাংলাদেশের বিদ্যুৎ গ্রিডের নতুন দুর্বলতা ও টেকসই সমাধানের খোঁজে

প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম  avatar   
প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম
এলএনজি নির্ভরতা: বাংলাদেশের বিদ্যুৎ গ্রিডের নতুন দুর্বলতা ও টেকসই সমাধানের খোঁজে
এলএনজি নির্ভরতা: বাংলাদেশের বিদ্যুৎ গ্রিডের নতুন দুর্বলতা ও টেকসই সমাধানের খোঁজে
ছবি: সংগৃহীত
গত অর্থবছরে, অর্থাৎ ২০২২-২৩ সালে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এবং পেট্রোবাংলা সম্মিলিতভাবে রেকর্ড পরিমাণ ৮৫ হাজার কোটি টাকার লোকসান গুনেছে, যার ...

গত অর্থবছরে, অর্থাৎ ২০২২-২৩ সালে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এবং পেট্রোবাংলা সম্মিলিতভাবে রেকর্ড পরিমাণ ৮৫ হাজার কোটি টাকার লোকসান গুনেছে, যার সিংহভাগই এসেছে উচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির কারণে। এই বিপুল আর্থিক চাপ কেবল রাষ্ট্রীয় কোষাগারকেই দুর্বল করছে না, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত করে দেশের শিল্প উৎপাদন ও জনজীবনকেও সরাসরি প্রভাবিত করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামের অস্থিরতা এবং ডলার সংকটের কারণে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি ক্রয়ে সরকারের হিমশিম খাওয়া বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদী টেকসইতার উপর গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে, সম্প্রতি কাতারের রাসগ্যাস (RasGas) এবং ওমানের ওকিউটিটি (OQTT) এর সাথে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি থাকা সত্ত্বেও, বর্ধিত বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে স্পট মার্কেট নির্ভরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে প্রায় ২৭,০০০ মেগাওয়াটের বেশি হলেও, জ্বালানি স্বল্পতার কারণে প্রায়শই তা অর্ধেকেরও কম ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে। এই জ্বালানি স্বল্পতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো দেশীয় গ্যাস মজুদের দ্রুত ক্ষয় এবং তার ফলস্বরূপ এলএনজির উপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ২,০০০-২,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন হয়, যা মোট চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। অবশিষ্ট চাহিদা মেটাতে দৈনিক প্রায় ৮০০-১,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে, যার মধ্যে প্রায় ৫০০-৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট আসে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির অধীনে এবং বাকিটা স্পট মার্কেট থেকে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ব্যয় ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যার একটি বড় অংশ হবে এলএনজি। এই পরিস্থিতি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়কে অস্থিতিশীল করে তুলছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের উপর উচ্চ বিদ্যুৎ বিলের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) উভয়ই তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জ্বালানি মিশ্রণে এলএনজির উচ্চ অনুপাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত স্থানান্তরের উপর জোর দিয়েছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এর তথ্যমতে, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬২ শতাংশ আসে গ্যাস-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে, যার একটি বড় অংশ আমদানি করা এলএনজি দ্বারা চালিত। এই উচ্চ নির্ভরতা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ গ্রিডকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের উঠা-নামার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়া অথবা বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোতে এলএনজির চাহিদা বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের জন্য তা সরাসরি বিদ্যুৎ সংকট ডেকে আনে। উদাহরণস্বরূপ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্য প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) প্রায় ৩০-৫০ ডলারে পৌঁছে যাওয়ায়, বাংলাদেশ স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা প্রায় বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়, যার ফলস্বরূপ দেশব্যাপী ব্যাপক লোডশেডিং দেখা দেয়। এই পরিস্থিতি দেশের শিল্প খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, উৎপাদন কমেছে এবং রপ্তানি আদেশ পূরণে বিলম্ব হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও, দীর্ঘমেয়াদী টেকসই সমাধানের অভাবে এই সমস্যা বারবার ফিরে আসছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে গৃহীত বিভিন্ন পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর কথা বলা হলেও, বাস্তবায়নের গতি এখনো ধীর।

জ্বালানি উৎস ২০১৮-১৯ অর্থবছর (উৎপাদন অংশীদারি) ২০২২-২৩ অর্থবছর (উৎপাদন অংশীদারি) উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন (শতাংশ পয়েন্ট)
গ্যাস (দেশীয় + আমদানি করা এলএনজি) ৬৪% ৬২% -২%
ফার্নেস তেল ২৫% ২৬% +১%
কয়লা ৩% ৮% +৫%
ডিজেল ৫% ২% -৩%
নবায়নযোগ্য (সৌর, জলবিদ্যুৎ) ২% ২% ০%
আমদানি (ভারত থেকে) ১% ০% -১%

উৎস: বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বার্ষিক প্রতিবেদন, ২০২২-২৩ এবং পূর্ববর্তী বছরগুলো।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত 'নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০০৮' এর কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ও সময়সীমা নির্ধারণ করা। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কমপক্ষে ২০% নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য দ্রুতগতিতে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে এবং এক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এর কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা কাজে লাগাতে হবে।
  • পেট্রোবাংলাকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য অবিলম্বে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে এবং 'পেট্রোলিয়াম আইন, ১৯৭৪' এর আওতায় নতুন অনুসন্ধান ব্লক চিহ্নিত করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে। পাশাপাশি, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং ওয়ার্কওভার কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
  • বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কে একটি সমন্বিত জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল (Integrated Energy Security Strategy) প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে এলএনজির পাশাপাশি কয়লা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যকে অন্তর্ভুক্ত করে জ্বালানি মিশ্রণে ভারসাম্য আনা হবে। এই কৌশলের আওতায়, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠানামা মোকাবিলার জন্য একটি 'জ্বালানি মূল্য স্থিতিশীলকরণ তহবিল' গঠন করা যেতে পারে, যা 'জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল আইন, ২০১০' এর অধীনে পরিচালিত হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম

প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি সংকট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator