ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য: সীমান্তে আটকে থাকা সম্ভাবনার অজানা গল্প | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য: সীমান্তে আটকে থাকা সম্ভাবনার অজানা গল্প

মেহেদী হাসান  avatar   
মেহেদী হাসান
ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য: সীমান্তে আটকে থাকা সম্ভাবনার অজানা গল্প
ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য: সীমান্তে আটকে থাকা সম্ভাবনার অজানা গল্প
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ভারত থেকে বাংলাদেশে আমদানি প্রায় ৬.৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময...

সম্প্রতি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ভারত থেকে বাংলাদেশে আমদানি প্রায় ৬.৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি। তবে, এই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি মাত্র ১.২৩ বিলিয়ন ডলারে সীমাবদ্ধ রয়েছে, যা বিশাল বাণিজ্য ঘাটতিকে স্পষ্ট করে। যদিও উভয় দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো (EPB) দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সচেষ্ট, স্থলবন্দরের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, শুল্ক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এবং মান যাচাইয়ের জটিলতা এই বিশাল সম্ভাবনাকে অনেকটাই আটকে রেখেছে। বিশেষত, বেনাপোল-পেট্রাপোল, আখাউড়া-আগরতলা এবং ভোমরা-ঘোজাডাঙ্গা স্থলবন্দরে পণ্য খালাসে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাক আটকে থাকার ঘটনা নিয়মিত খবর, যা কেবল পচনশীল পণ্যের ক্ষতিই নয়, বরং সামগ্রিক সাপ্লাই চেইনকেও ব্যাহত করছে।

এই বাণিজ্য ঘাটতি ও সীমান্ত জটিলতার মূলে রয়েছে অ-শুল্ক বাধা (Non-Tariff Barriers) এবং সমন্বিত সীমান্তের অভাব। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, ভারতীয় পণ্যের মান যাচাই ও সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শই দীর্ঘসূত্রিতার শিকার হয়, বিশেষ করে কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত পণ্যের ক্ষেত্রে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য ভারতীয় শুল্ক কর্তৃপক্ষ (NBR) কর্তৃক আরোপিত কিছু নিয়মাবলী, যেমন ভারতীয় মানদণ্ড ব্যুরো (BIS) সার্টিফিকেশন, প্রায়শই অতিরিক্ত সময় ও খরচ সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে, যদিও বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানিযোগ্য অনেক পণ্য রয়েছে, যেমন তৈরি পোশাক, পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্য, মসলা এবং মাছ, কিন্তু এই প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে সেগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারছে না। দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিন ধরে চললেও, বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে এই সমস্যাগুলো আরও প্রকট হচ্ছে।

স্থলবন্দরের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং ডিজিটাল লেনদেনের অভাবও ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধক। উদাহরণস্বরূপ, বেনাপোল বন্দরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০-৬০০ পণ্যবাহী ট্রাক ভারত থেকে প্রবেশ করে, কিন্তু পর্যাপ্ত স্ক্যানার, ওয়্যারহাউস এবং পার্কিং সুবিধার অভাবে পণ্য খালাসে অস্বাভাবিক বিলম্ব হয়। একইসাথে, ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর অধীনে ডিজিটাল লেনদেন ও অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেমের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সীমান্ত বাণিজ্য আরও কঠিন হয়ে পড়ে। যদিও উভয় দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ক্রস-বর্ডার ইলেকট্রনিক পেমেন্ট সিস্টেম চালুর বিষয়ে আলোচনা করছে, এর কার্যকর বাস্তবায়ন এখনও অনেক দূরে। এটি কেবল রপ্তানি প্রক্রিয়াকেই জটিল করে না, বরং অবৈধ বাণিজ্যকেও উৎসাহিত করে, যার ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারায়।

অর্থবছর ভারতে রপ্তানি (মিলিয়ন USD) ভারত থেকে আমদানি (মিলিয়ন USD) বাণিজ্য ঘাটতি (মিলিয়ন USD)
২০২০-২১ ১২২৯.৬ ৮৫৮৮.৭ -৭৩৫৯.১
২০২১-২২ ১৯৯২.৬ ১৩৬৯৩.৬ -১১৭০১.০
২০২২-২৩ ১৭১৬.০ ১১৭৪০.০ -১০০২৪.০
২০২৩-২৪ (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ১২৩০.০ ৬৩৫০.০ -৫১২০.০

উৎস: এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো (EPB) ও বাংলাদেশ ব্যাংক।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ ও ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দ্রুত একটি সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা চুক্তি (Integrated Border Management Agreement) বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে প্রতিটি স্থলবন্দরে পণ্য খালাসের জন্য একক উইন্ডো সিস্টেম এবং সার্বক্ষণিক কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের ব্যবস্থা থাকবে, যা NBR এবং ভারতীয় শুল্ক কর্তৃপক্ষের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানকে গতিশীল করবে।
  • বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংককে BSEC এর তত্ত্বাবধানে একটি দ্বি-পাক্ষিক ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়ে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা সীমান্ত বাণিজ্যে অনলাইন লেনদেনকে সহজ করবে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ক্রেডিট লাইন ও ফরেন এক্সচেঞ্জ সাপোর্টের ব্যবস্থা করবে।
  • EPB এবং ভারতীয় বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে উভয় দেশের মানদণ্ড ও সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়াকে (যেমন BIS ও BSTI) পারস্পরিক স্বীকৃতি (Mutual Recognition Agreement - MRA) প্রদান করতে হবে, যাতে পণ্যের মান যাচাইয়ে সময় ও খরচ কমানো যায় এবং অপ্রয়োজনীয় অ-শুল্ক বাধা দূর হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মেহেদী হাসান

মেহেদী হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator