দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে অনলাইন শিক্ষা: সম্ভাবনার দৌড় না বাস্তবতার ফাঁদ? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে অনলাইন শিক্ষা: সম্ভাবনার দৌড় না বাস্তবতার ফাঁদ?

ফারিহা আফরিন  avatar   
ফারিহা আফরিন
দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে অনলাইন শিক্ষা: সম্ভাবনার দৌড় না বাস্তবতার ফাঁদ?
দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে অনলাইন শিক্ষা: সম্ভাবনার দৌড় না বাস্তবতার ফাঁদ?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) আয়োজিত একটি সেমিনারে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের (ICT Division) একজন...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) আয়োজিত একটি সেমিনারে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের (ICT Division) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন যে, ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের আইটি ও আইটিইএস খাতে অতিরিক্ত ৫ লক্ষ দক্ষ জনবল তৈরি করতে অনলাইন শিক্ষা এক অপরিহার্য মাধ্যম। এই ঘোষণা একদিকে যেমন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করে, তেমনি অন্যদিকে প্রশ্ন তোলে যে, আমাদের বর্তমান অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা কি সেই লক্ষ্য পূরণে যথেষ্ট সক্ষম, নাকি এটি বাস্তবতার এক জটিল ফাঁদ?

অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্মগুলো, বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারীর পর থেকে, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে দক্ষতা অর্জনের এক নতুন পথ খুলে দিয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও এখন বিশ্বমানের কোর্সগুলোতে অংশ নিতে পারছে, যা পূর্বে ছিল অকল্পনীয়। ‘অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন’ (a2i) প্রোগ্রামের অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচী এবং জাতীয় ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্মগুলো পেশাদার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলো কেবল অ্যাকাডেমিক জ্ঞান নয়, বরং প্রোগ্রামিং, ডেটা সায়েন্স, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং গ্রাফিক্স ডিজাইনের মতো প্রযুক্তি-নির্ভর দক্ষতা অর্জনেও সহায়তা করছে, যা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অত্যন্ত জরুরি। এই উদ্যোগগুলো শ্রমবাজারে প্রবেশে ইচ্ছুক তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে এবং দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখছে।

তবে, সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তবতার কিছু কঠোর দিকও রয়েছে। অনলাইন শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাপ্ত সনদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে এখনও অনেক প্রশ্ন বিদ্যমান। অনেক সময় অনলাইন কোর্সগুলো তাত্ত্বিক জ্ঞান প্রদানে পারদর্শী হলেও, ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে থাকে। এছাড়া, দেশের সর্বত্র উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধার অভাব একটি বড় বাধা। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC) ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করলেও, শহর ও গ্রামের মধ্যে ডিজিটাল বিভাজন এখনও প্রকট। এটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন যে, অনলাইন শিক্ষা যেন শুধুমাত্র নগরকেন্দ্রিক সুবিধাভোগীদের জন্য সীমাবদ্ধ না থাকে। মানসম্মত শিক্ষকের অভাব এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান, যা দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রক্রিয়াকে শ্লথ করে দিতে পারে।

এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে অনলাইন শিক্ষাকে সফল করতে হলে একটি সমন্বিত ও সুপরিকল্পিত কৌশল প্রয়োজন। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) কর্তৃক পরিচালিত হাই-টেক পার্কগুলোতে অনলাইন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ অবকাঠামো এবং সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা যেতে পারে, যা ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের অভাব পূরণে সহায়ক হবে। শিল্প খাতের সাথে অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্মগুলোর নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করে চাহিদা-ভিত্তিক কোর্স প্রণয়ন করা জরুরি, যাতে শিক্ষার্থীরা বাজারের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে। এছাড়া, অনলাইন শিক্ষার জন্য একটি জাতীয় মানদণ্ড নির্ধারণ এবং তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা আবশ্যক, যাতে প্রাপ্ত সনদগুলো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে সমানভাবে স্বীকৃত হয়।

সূচক ২০২১ ২০২২ ২০২৩ (প্রাক্কলিত)
অনলাইন কোর্স সম্পন্নকারীর সংখ্যা (ICT Division কর্তৃক নিবন্ধিত) ১,৮৫,০০০ ২,৫০,০০০ ৩,২০,০০০
ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা (কোটি) ১১.২৪ ১২.৬৭ ১৩.৯৮
অনলাইন শিক্ষায় BASL-এর বিনিয়োগ বৃদ্ধি (%) ১২% ১৫% ১৮%
গ্রামীণ এলাকায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের আওতা (%) ৪৮% ৫৬% ৬৪%

উৎস: BTRC বার্ষিক প্রতিবেদন, BASIS এডটেক সার্ভে, ICT Division ডেটা

সুপারিশ

  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের (ICT Division) অধীনে একটি 'জাতীয় অনলাইন শিক্ষা মানদণ্ড ও স্বীকৃতি বোর্ড' প্রতিষ্ঠা করা হোক, যা অনলাইন কোর্সের গুণগত মান নিশ্চিত করবে এবং প্রাপ্ত সনদগুলোর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করবে।
  • বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC) এবং বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) যৌথ উদ্যোগে দেশের গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট অবকাঠামো সম্প্রসারণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনিয়োগ করুক এবং হাই-টেক পার্কগুলোতে অনলাইন প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করুক।
  • বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এবং অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রাম পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী অনলাইন কোর্স কারিকুলাম তৈরি করবে এবং শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে ইন্টার্নশিপ ও মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারিহা আফরিন

ফারিহা আফরিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ইডটেক (EdTech) ও অনলাইন এডুকেশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator