সম্প্রতি, রাজধানী ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত নির্মিত বিআরটি প্রকল্পের নকশা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় জনসম্পৃক্ততার অভাব এবং ডেটা-ভিত্তিক উপাত্ত বিশ্লেষণে ত্রুটি নিয়ে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে এক ধরণের মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। এই মতানৈক্য কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্পের কারিগরি জটিলতা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের স্মার্ট সিটি ও নগর পরিকল্পনায় জনসম্পৃক্ততা ও ডেটা-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মৌলিক ঘাটতিকেই প্রকট করে তুলেছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এডিবি’র অর্থায়নে পরিচালিত এমন বৃহৎ প্রকল্পে, যেখানে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ নগরবাসীর জীবনযাত্রার মান জড়িত, সেখানে প্রাথমিক পর্যায়েই স্থানীয় জনগণের চাহিদা, চলাচলের ধরণ এবং পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট ডেটা বিশ্লেষণ করে তাদের মতামতকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াটি প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। ফলে, যখন প্রকল্প বাস্তবায়নের পর নগরবাসী অপ্রত্যাশিত সমস্যার সম্মুখীন হন, তখন তা কেবল একটি পরিকল্পনার ত্রুটি হিসেবেই বিবেচিত হয় না, বরং এটি ভবিষ্যৎ নগর উন্নয়নে জনআস্থা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এক বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনায় ডেটা-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্ব অপরিহার্য হলেও, এর বাস্তবায়নে প্রায়শই পদ্ধতিগত দুর্বলতা লক্ষ্য করা যায়। যেমন, ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (DMDP) বা ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান প্রণয়নের সময় যেসকল ডেটা ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর অনেকগুলোই পুরনো এবং বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পরিচালিত সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নগর এলাকার জনসংখ্যা ঘনত্ব, যানজটের ধরণ, বর্জ্য উৎপাদন এবং জলাবদ্ধতার মতো মৌলিক তথ্যগুলো সংগ্রহে আধুনিক প্রযুক্তি ও পদ্ধতি প্রয়োগের অভাব রয়েছে। World Bank এর 'Urbanization in Bangladesh: Trends, Challenges, and a Way Forward' শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নগর কর্তৃপক্ষগুলো প্রায়শই ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে সীমিত সক্ষমতার কারণে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে জন-চাহিদার সঠিক প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়। উদাহরণস্বরূপ, যখন কোনো স্মার্ট ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম স্থাপন করা হয়, তখন তার প্রাথমিক কার্যকারিতা মূল্যায়নে জনগণের দৈনন্দিন যাতায়াত অভ্যাস, গণপরিবহনের ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যার মতো ডেটাগুলো পর্যাপ্তভাবে বিশ্লেষণ করা হয় না। ফলে, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত সিস্টেমগুলো কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হয় এবং নগরবাসীর দুর্ভোগ লাঘব হয় না। এই ডেটার অভাব কেবল প্রকল্প বাস্তবায়নেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি নগর উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদী কৌশল প্রণয়ন, ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
জনসম্পৃক্ততার অভাব নগর পরিকল্পনাকে আরও জটিল করে তোলে। একটি স্মার্ট সিটি প্রকল্প কেবল প্রযুক্তিগত অবকাঠামো স্থাপন নয়, বরং এটি নাগরিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং তাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা। ADB'র 'Liveable Cities for All: A Strategy for Urban Development' শীর্ষক নীতিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নগর পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় স্থানীয় জনগণের মতামত, চাহিদা এবং অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত। অথচ, বাংলাদেশের নগর উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে, বিশেষ করে ঢাকার মতো মেগাসিটিতে, 'পাবলিক কনসালটেশন' বা জনমত যাচাই প্রক্রিয়া প্রায়শই আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, যেমন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে জনমত সংগ্রহের চেষ্টা করলেও, সেই মতামতগুলো নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে কতটা গুরুত্ব পায় তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। উদাহরণস্বরূপ, নতুন কোনো পার্ক বা পাবলিক স্পেস তৈরির পরিকল্পনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামত, তাদের ব্যবহারের ধরণ এবং নিরাপত্তা সম্পর্কিত উদ্বেগগুলো প্রায়শই উপেক্ষা করা হয়। এর ফলস্বরূপ, নির্মিত অবকাঠামো হয়তো আধুনিক দেখায়, কিন্তু তা জনগণের প্রকৃত চাহিদা পূরণ করতে পারে না এবং প্রায়শই অব্যবহৃত থেকে যায়। এই জনসম্পৃক্ততার অভাব কেবল সামাজিক অসন্তোষই তৈরি করে না, বরং এটি প্রকল্প বাস্তবায়নে অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ হয়। নগর পরিকল্পনার সকল স্তরে, বিশেষ করে ধারণাগত পর্যায় থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ পর্যন্ত, নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক, যা একটি ডেটা-ভিত্তিক এবং জনমুখী নগর উন্নয়নের পূর্বশর্ত।
| প্রকল্প/ক্ষেত্র | ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে ঘাটতি | জনসম্পৃক্ততায় ঘাটতি | প্রভাব |
|---|---|---|---|
| স্মার্ট ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম | যানবাহনের রিয়েল-টাইম ডেটা (৬০% ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ), যাত্রী চলাচলের ধরণ (৭০% ক্ষেত্রে অনিয়মিত জরিপ) | প্রাক-প্রকল্প আলোচনায় নাগরিক অংশগ্রহণ (১৫% এর কম) | যানজট বৃদ্ধি (২০% অতিরিক্ত), সিস্টেমের অকার্যকারিতা |
| বর্জ্য ব্যবস্থাপনা | বর্জ্য উৎপাদন ও ধরণ সম্পর্কিত ডেটা (৫০% ক্ষেত্রে আপডেট নেই), বর্জ্য পৃথকীকরণ ডেটা (৮০% ক্ষেত্রে অনুপস্থিত) | বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণে স্থানীয়দের মতামত (১০% এর কম) | পরিবেশ দূষণ বৃদ্ধি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উচ্চ খরচ |
| নতুন আবাসন প্রকল্প | জনসংখ্যার ঘনত্ব ও ভূ-ব্যবহারের ডেটা (৪০% ক্ষেত্রে পুরনো), সামাজিক অবকাঠামোর চাহিদা ডেটা (৬৫% ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত) | ভূমি অধিগ্রহণ ও নকশা প্রণয়নে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ (২০% এর কম) | অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ন |
| জলাবদ্ধতা নিরসন | বৃষ্টিপাত, ড্রেনেজ সিস্টেমের সক্ষমতা ডেটা (৭০% ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত), ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ডেটা (৫০% ক্ষেত্রে অনুপস্থিত) | ড্রেন পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ (২৫% এর কম) | বারবার জলাবদ্ধতা, নাগরিক দুর্ভোগ |
উৎস: বাংলাদেশ সরকার (স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর), World Bank (Urbanization Reports), ADB (Urban Development Strategy), এবং বিভিন্ন গণমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক জরিপ (২০২০-২০২৩)।
সুপারিশ
- স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা) আইন ২০০৯ এর আলোকে, সকল নগর উন্নয়ন প্রকল্পে একটি বাধ্যতামূলক 'নাগরিক ডেটা ও জনসম্পৃক্ততা সেল' গঠন করা হোক। এই সেলের কাজ হবে, প্রকল্পের ধারণাগত পর্যায় থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন ও মনিটরিং পর্যন্ত স্থানীয় জনগণের মতামত, চাহিদা এবং সংশ্লিষ্ট ডেটা (যেমন: ট্রাফিক প্যাটার্ন, জনসংখ্যার ঘনত্ব, বর্জ্য উৎপাদন) ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং নীতি নির্ধারকদের কাছে উপস্থাপন করা। এই সেলকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতে হবে।
- বাংলাদেশ সরকারের 'জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা ২০১৮' এবং 'জাতীয় ডেটা সুরক্ষা আইন ২০২৩' এর সাথে সঙ্গতি রেখে, একটি কেন্দ্রীয় 'নগর ডেটা হাব' প্রতিষ্ঠা করা। এই হাবটি নগর পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট সকল ডেটা (যেমন: GIS ডেটা, স্যাটেলাইট ইমেজারি, সামাজিক-অর্থনৈতিক সূচক) একটি একক ও উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ করবে, যা সকল সিটি কর্পোরেশন, নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্য অ্যাক্সেসযোগ্য হবে। World Bank এবং ADB এর কারিগরি সহায়তায় এর বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
- নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন ২০২০ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এর অধীনে, সকল বড় নগর অবকাঠামো প্রকল্পে (যেমন: স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম, নতুন আবাসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট) 'এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (EIA)' এবং 'সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (SIA)' এর পাশাপাশি 'পাবলিক পারটিসিপেশন অ্যাসেসমেন্ট (PPA)' বাধ্যতামূলক করা হোক। এই PPA প্রতিবেদনে প্রকল্পের সম্ভাব্য সুবিধাভোগী ও ক্ষতিগ্রস্তদের মতামত, বিকল্প প্রস্তাবনা এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট কৌশল অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য বাধ্যতামূলক হবে।