সম্প্রতি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৩০% গ্যাস স্বল্পতার কারণে অব্যবহৃত ছিল, যার সিংহভাগই ছিল জাতীয় গ্রিডকে স্থিতিশীল রাখার জন্য জরুরি বেজলোড প্ল্যান্ট। স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি প্রক্রিয়া বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, যা একদিকে যেমন বিদ্যুৎ সরবরাহকে অনিশ্চিত করে তুলেছে, তেমনই অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জাতীয় গ্রিডের স্থিতিশীলতার জন্য এক গভীর অশনি সংকেত, যা এলএনজি নির্ভরতার ফাঁদে বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যৎকে এক গুরুতর প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে প্রায় ২৭,০০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছেছে, কিন্তু প্রকৃত উৎপাদন প্রায়শই ১৫,০০০ মেগাওয়াটের নিচে থাকে। এর মূল কারণ হচ্ছে প্রাথমিক জ্বালানির তীব্র সংকট, বিশেষ করে দেশীয় গ্যাসের অপ্রতুলতা এবং এলএনজি আমদানির উপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২,৫০০ থেকে ২,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যার প্রায় ৭০০-১,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। বিশ্ববাজারে এলএনজির দামের অস্বাভাবিক ওঠানামা, বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২২ সালে স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ (মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) এলএনজির দাম ৭০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যেখানে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির অধীনে এর দাম ছিল ১২-১৫ ডলারের মধ্যে। এই উচ্চমূল্যের কারণে সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী এলএনজি কিনতে ব্যর্থ হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জাতীয় গ্রিডের নির্ভরযোগ্যতার উপর। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) প্রায়শই উচ্চমূল্যের কারণে এলএনজি আমদানি বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছে, যা শিল্প উৎপাদন এবং দৈনন্দিন জনজীবনে লোডশেডিং আকারে প্রতিফলিত হচ্ছে।
এলএনজি নির্ভরতা কেবল বর্তমান সংকটকেই তীব্র করছে না, বরং বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (IMF) এবং বিশ্বব্যাংক (World Bank) উভয়ই বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির উপর অতিমাত্রায় নির্ভরতার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছে। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর চাপ কমানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জ্বালানি মিশ্রণে বৈচিত্র্য আনা অপরিহার্য। বর্তমানে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের হিস্যা প্রায় ৫০-৫৫%, যেখানে কয়লার অবদান প্রায় ২৫-৩০% এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির হিস্যা মাত্র ৫%। এই ভারসাম্যহীনতা বাংলাদেশকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে। বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা (Power System Master Plan) অনুযায়ী, ২০৪১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশীদারি ৪০% এ উন্নীত করার কথা থাকলেও, বাস্তবায়ন অত্যন্ত ধীরগতিতে এগোচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) একাধিকবার নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিলেও, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে তা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দেখেনি। এই পরিস্থিতিতে, জাতীয় গ্রিডকে স্থিতিশীল রাখতে এবং ভবিষ্যতের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে হলে, শুধুমাত্র এলএনজি নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য উৎস ও দেশীয় জ্বালানির অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দেওয়া অত্যাবশ্যক।
সরকারের জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল (Energy Security Fund) থেকে ভর্তুকি দিয়ে এলএনজি আমদানি করা হলেও, এই পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত তিন বছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যার একটি বড় অংশ ব্যয় হয়েছে আমদানি করা জ্বালানির মূল্য পরিশোধে। এই ভর্তুকির বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের উপরই চাপানো হয়, যা বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে সুশাসন এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে, এই সংকট আরও গভীর হতে পারে। তারা জ্বালানি চুক্তিগুলোতে আরও স্বচ্ছতা এবং প্রতিযোগিতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি সরবরাহ চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দর কষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে। পাশাপাশি, বাংলাদেশ সরকার এবং পেট্রোবাংলাকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে আরও আগ্রাসী ভূমিকা পালন করতে হবে। বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়া বারবার পিছিয়ে যাওয়ায় দেশীয় উৎস থেকে জ্বালানি প্রাপ্তির সম্ভাবনা সীমিত হয়েছে, যা এলএনজি নির্ভরতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
| বছর | মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা (মেগাওয়াট) | গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা (%) | নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশীদারি (%) | এলএনজি আমদানি ব্যয় (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) |
|---|---|---|---|---|
| ২০১৮-১৯ | ২২,০০০ | ৬৮% | ৩% | ১.৫ |
| ২০১৯-২০ | ২৩,০০০ | ৬২% | ৪% | ২.২ |
| ২০২০-২১ | ২৪,০০০ | ৬১% | ৪.৫% | ৩.৮ |
| ২০২১-২২ | ২৫,৫০০ | ৫৫% | ৫% | ৬.০ |
| ২০২২-২৩ | ২৭,০০০ | ৫০% | ৫.২% | ৫.৫ (অনুমানিত) |
উৎস: বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), পেট্রোবাংলা, বাংলাদেশ ব্যাংক, World Bank প্রতিবেদন
সুপারিশ
- বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে জাতীয় জ্বালানি নীতি-২০২১ (প্রস্তাবিত) এর আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ২৫% এ উন্নীত করতে হবে এবং এ লক্ষ্যে বিশেষ তহবিল ও দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
- পেট্রোবাংলাকে বঙ্গোপসাগরের অগভীর ও গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়া অবিলম্বে সম্পন্ন করে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন (OGEC) আইন-২০১০ এর অধীনে দ্রুত চুক্তি স্বাক্ষর ও কার্যক্রম শুরু করতে হবে, যাতে দেশীয় গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি পায়।
- বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে World Bank এবং ADB-এর সুপারিশ মেনে জ্বালানি আমদানির চুক্তিগুলোতে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক দর কষাকষির প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর চাপ কমাতে দীর্ঘমেয়াদী, স্থির-মূল্যের এলএনজি চুক্তির দিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।