সম্প্রতি, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি হলেও, এর সিংহভাগই শহরাঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট প্রবেশাধিকার ও এর গুণগত মান এখনো অনেক পিছিয়ে। এই প্রেক্ষাপটে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) কর্তৃক পরিচালিত 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' রূপকল্পের অধীনে ইডটেক ও অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় দ্বার উন্মোচন করলেও, ডিজিটাল বৈষম্য নিরসনের চ্যালেঞ্জগুলো প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে অনলাইন শিক্ষার অপরিহার্যতা যেভাবে অনুভূত হয়েছে, তা প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা একটি গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশের ইডটেক খাত, বিশেষ করে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এর তত্ত্বাবধানে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অনেক স্থানীয় স্টার্টআপ এবং প্ল্যাটফর্ম শিক্ষাকে সহজলভ্য ও আকর্ষণীয় করতে নতুন নতুন সমাধান নিয়ে আসছে। তবে, এই উদ্ভাবনগুলোর সুফল প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানো এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উদাহরণস্বরূপ, অনলাইন ক্লাস বা ডিজিটাল কন্টেন্ট ব্যবহারের জন্য যে স্থিতিশীল উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ প্রয়োজন, তা দেশের অনেক গ্রামীণ এলাকায় এখনো অনুপস্থিত। বিটিআরসি-এর তথ্যমতে, ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ শহরাঞ্চলে দ্রুত হলেও, দুর্গম অঞ্চলে এর গতি অত্যন্ত মন্থর। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা মানসম্মত অনলাইন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা তাদের একাডেমিক অগ্রগতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং শহুরে শিক্ষার্থীদের সাথে তাদের ব্যবধান বাড়িয়ে তুলছে।
এই ডিজিটাল বৈষম্য কেবল ইন্টারনেট সংযোগের অভাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ডিজিটাল ডিভাইসের সহজলভ্যতা এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবও এর অন্যতম কারণ। অনেক প্রত্যন্ত পরিবারের পক্ষে স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা ট্যাবলেটের মতো ডিভাইস কেনা আর্থিক কারণে সম্ভব হয় না। এছাড়া, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং সচেতনতার অভাবও একটি বড় বাধা। অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রামের মাধ্যমে সরকার বিভিন্ন ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন করে ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছে, কিন্তু এর কার্যকারিতা প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি ঘরে পৌঁছাতে এখনো অনেক পথ বাকি। শিক্ষকদের অনলাইন শিক্ষাদানের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা না থাকাও এই সমস্যার মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত অনলাইন শিক্ষার অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে বাধা সৃষ্টি করছে।
এই ডিজিটাল বিভাজন বাংলাদেশের সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যদি প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা আধুনিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে তারা ভবিষ্যতে শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) দেশের বিভিন্ন স্থানে হাই-টেক পার্ক স্থাপন করে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির চেষ্টা করছে। কিন্তু, এই পার্কগুলোর সুবিধা যদি প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানো না যায়, তবে তা কেবল শহুরে কেন্দ্রিক উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ থাকবে। ইডটেক খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে, এই বৈষম্য নিরসনে সুদূরপ্রসারী এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য, যাতে প্রতিটি শিক্ষার্থী, সে যে অঞ্চলেই বসবাস করুক না কেন, ডিজিটাল শিক্ষার সমান সুযোগ পায়।
| সূচক | ২০১৮ | ২০২০ | ২০২২ | ২০২৪ (প্রাক্কলিত) |
|---|---|---|---|---|
| শহুরে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (% মোট শহুরে জনসংখ্যা) | ৫২% | ৬৭% | ৭৮% | ৮৫% |
| গ্রামীণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (% মোট গ্রামীণ জনসংখ্যা) | ২৮% | ৩৭% | ৪৫% | ৫২% |
| প্রাথমিক স্তরে অনলাইন শিক্ষায় অংশগ্রহণ (% মোট শিক্ষার্থী) | ৫% | ২০% | ৩০% | ৪০% |
| মাধ্যমিক স্তরে অনলাইন শিক্ষায় অংশগ্রহণ (% মোট শিক্ষার্থী) | ১০% | ২৫% | ৪০% | ৫৫% |
| ইডটেক প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত শিক্ষক (হাজার) | ১০ | ৫০ | ১০০ | ১৫০ |
উৎস: বিটিআরসি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও BASIS-এর বিভিন্ন প্রতিবেদন অবলম্বনে (প্রাক্কলিত তথ্য সংযুক্ত)
সুপারিশ
- বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) যৌথভাবে 'প্রত্যন্ত অঞ্চল ইন্টারনেট সম্প্রসারণ প্রকল্প' (Rural Internet Expansion Project) দ্রুত বাস্তবায়ন করবে, যার মাধ্যমে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক এবং ৪জি/৫জি কভারেজ দুর্গম গ্রামীণ এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্প্রসারিত হবে, এবং ইন্টারনেট সেবার মূল্য সাশ্রয়ী করার জন্য সুনির্দিষ্ট ভর্তুকি নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।
- অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রামের মাধ্যমে 'ডিজিটাল সাক্ষরতা ও ডিভাইস বিতরণ প্রকল্প' (Digital Literacy & Device Distribution Project) চালু করা হবে, যেখানে স্বল্প আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ কিস্তিতে বা ভর্তুকি মূল্যে ডিজিটাল ডিভাইস (যেমন ট্যাবলেট বা ল্যাপটপ) সরবরাহ করা হবে এবং শিক্ষকদের জন্য অনলাইন শিক্ষাদানের ওপর বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হবে, যা জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB) অনুমোদিত হবে।
- বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এবং বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) এর মাধ্যমে স্থানীয় ইডটেক স্টার্টআপগুলোকে 'প্রত্যন্ত অঞ্চল ইডটেক উদ্ভাবন তহবিল' (Remote Area EdTech Innovation Fund) থেকে বিশেষ আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হবে, যাতে তারা অফলাইন মোডে কাজ করতে সক্ষম এবং স্থানীয় ভাষার উপযোগী শিক্ষামূলক অ্যাপ ও প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে উৎসাহিত হয়, যা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মানদণ্ড অনুযায়ী হবে।