সম্প্রতি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) আয়োজিত একটি সেমিনারে এডিটেক খাতের সম্ভাবনা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে, যেখানে উল্লেখ করা হয় যে ২০২৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক এডিটেক বাজারের আকার ৫০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের এডিটেক ইকোসিস্টেমের দ্রুত বিকাশ অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক হলেও, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছু সত্য, মিথ এবং গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ যা নিয়ে গভীর আলোচনা প্রয়োজন। কোভিড-১৯ মহামারীর সময়কালে অনলাইন শিক্ষার অপরিহার্যতা যেভাবে অনুভূত হয়েছে, তা এই খাতের দ্রুত প্রসারে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে। তবে, এই প্রসারের গতি ধরে রাখতে এবং এর সুফল সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে দিতে কাঠামোগত সংস্কার ও সুচিন্তিত নীতিমালার প্রয়োজন অনস্বীকার্য।
এডিটেক এবং অনলাইন শিক্ষা শুধু একটি সাময়িক প্রবণতা নয়, বরং এটি শিক্ষার ভবিষ্যৎ পথনির্দেশক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যদিও বাংলাদেশে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে নতুন, তবুও এর সম্ভাবনা বিশাল। বিশেষ করে, উন্নত ইন্টারনেট অবকাঠামো এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার প্রসারের সাথে সাথে এই খাত নতুন মাত্রা পাচ্ছে। তবে, একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে অনলাইন শিক্ষা কেবল প্রচলিত শ্রেণীকক্ষের একটি ডিজিটাল প্রতিরূপ। বাস্তবে, এডিটেক শুধু পাঠ্যক্রমকে অনলাইনে নিয়ে আসে না, বরং এটি শেখার পদ্ধতি, বিষয়বস্তুর উপস্থাপনা এবং মূল্যায়নে নতুনত্বের সুযোগ তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) ও মেশিন লার্নিং (ML) ব্যবহার করে ব্যক্তিগতকৃত শেখার অভিজ্ঞতা (Personalized Learning Experience) প্রদান করা সম্ভব, যা প্রতিটি শিক্ষার্থীর চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। এছাড়াও, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো দেশের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা দূর করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা প্রাপ্তির সুযোগ করে দিচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য কমাতে সহায়ক। BTRC-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা অনলাইন শিক্ষার প্রসারে একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করছে। তবে, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং এর গুণগত মান বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে ব্রডব্যান্ড সংযোগ এখনও একটি চ্যালেঞ্জ।
অনলাইন শিক্ষাকে ঘিরে আরেকটি সাধারণ মিথ হলো এটি প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার চেয়ে নিকৃষ্ট বা কম কার্যকর। এই ধারণাটি মূলত অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, শিক্ষকের প্রশিক্ষণের অভাব এবং উপযুক্ত ডিজিটাল বিষয়বস্তুর অভাবে তৈরি হয়েছে। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে অনলাইন শিক্ষা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি কার্যকর প্রমাণিত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ভার্চুয়াল ল্যাব, ইন্টারঅ্যাক্টিভ সিমুলেশন এবং গ্যামিফিকেশন (Gamification) এর মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে জটিল বিষয়গুলোকেও সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয় করে তোলা সম্ভব। ICT Division এবং a2i (Access to Information) এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্প, যেমন 'মুক্তপাঠ' বা 'শিক্ষক বাতায়ন', শিক্ষকদের ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধিতে এবং অনলাইন শিক্ষায় মানসম্মত বিষয়বস্তু তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এসব উদ্যোগ ডিজিটাল শিক্ষাকে মূলধারায় আনতে সহায়ক হচ্ছে। তবে, অনলাইন শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের এনগেজমেন্ট ধরে রাখা এবং তাদের মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে আরও গবেষণা ও উন্নয়ন প্রয়োজন। ডিজিটাল ডিভাইসের সহজলভ্যতা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিজিটাল বিভাজন (Digital Divide) কমানোও এডিটেক খাতের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। BHTPA (Bangladesh Hi-Tech Park Authority) দেশের বিভিন্ন স্থানে হাই-টেক পার্ক স্থাপন করে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে উৎসাহিত করছে, যা এডিটেক স্টার্টআপগুলোর জন্য সহায়ক হতে পারে।
| সূচক | ২০২০ | ২০২১ | ২০২২ | ২০২৩ | উৎস |
|---|---|---|---|---|---|
| ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (মিলিয়ন) | ১০৩.৭ | ১২৩.৮ | ১৩১.৯ | ১৩৯.৮ | BTRC |
| শিক্ষক বাতায়নে নিবন্ধিত শিক্ষক (হাজার) | ৪০০ | ৫৫০ | ৭০০ | ৮৫০ | a2i |
| মুক্তপাঠে কোর্স সম্পন্নকারী (মিলিয়ন) | ১.৫ | ২.৮ | ৪.২ | ৫.৫ | a2i |
| এডিটেক স্টার্টআপ বিনিয়োগ (মিলিয়ন USD) | ৫.২ | ১০.৭ | ১৫.৮ | ২০.১ | BASIS |
উৎস: বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC), একসেস টু ইনফরমেশন (a2i) এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এর বার্ষিক প্রতিবেদন।
সুপারিশ
- ICT Division এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে একটি জাতীয় এডিটেক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যা অনলাইন শিক্ষার মানদণ্ড, ডিজিটাল বিষয়বস্তু উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন পদ্ধতি সুনির্দিষ্ট করবে। এই নীতিমালায় ডেটা সুরক্ষা আইন, ২০১৮ (প্রস্তাবিত) এর আলোকে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করার বিধান অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
- BTRC-কে দেশের গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগের সহজলভ্যতা বাড়াতে 'ইউনিভার্সাল সার্ভিস অবলিগেশন (USO) তহবিল' ব্যবহার করে ব্রডব্যান্ড অবকাঠামো সম্প্রসারণে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং 'ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্স'-এর মাধ্যমে ইন্টারনেট খরচ কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
- BASIS এবং BHTPA-কে এডিটেক স্টার্টআপগুলোর জন্য বিশেষ ইনকিউবেশন প্রোগ্রাম ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল তহবিল গঠনে নেতৃত্ব দিতে হবে, যা আইসিটি আইন, ২০০৬ (সংশোধিত) এর আওতায় নিবন্ধিত স্টার্টআপগুলোকে গবেষণা ও উন্নয়নে আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে এবং 'স্টার্টআপ বাংলাদেশ'-এর সাথে সমন্বয় করে নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করবে।