সম্প্রতি, বিশ্বব্যাংক (World Bank) কর্তৃক বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নে $৫০ মিলিয়ন (প্রায় ৫৩০ কোটি টাকা) সহায়তার ঘোষণা এই খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিশেষ করে, 'সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পর্যটন উন্নয়ন প্রকল্প' (Cultural Heritage and Tourism Development Project) নামে এই উদ্যোগ দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর আধুনিক সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই প্রকল্প শুধু অর্থায়ন নয়, বরং আন্তর্জাতিক মান ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে বাংলাদেশের বহু বছরের পুরনো ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি সুদূরপ্রসারী প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়, যা অতীতে প্রায়শই অবহেলা ও অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনার শিকার হয়েছে।
এই পরিবর্তনের ঢেউয়ের পেছনে রয়েছে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ। প্রথমত, প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি প্রত্নতত্ত্ব ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জিআইএস (Geographic Information System), লিডার (LiDAR) স্ক্যানিং, ড্রোন প্রযুক্তি এবং থ্রিডি মডেলিংয়ের মতো অত্যাধুনিক পদ্ধতিগুলো এখন পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো চিহ্নিত করতে এবং বিদ্যমান নিদর্শনগুলোর নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণে সহায়তা করছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এখন আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন প্রত্নস্থল আবিষ্কারে সক্ষম হচ্ছে, যা পূর্বে সনাক্ত করা কঠিন ছিল। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নগরায়নের চাপ ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর ওপর মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছে। নদী ভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং অপরিকল্পিত নগরায়ন অনেক মূল্যবান প্রত্নসম্পদকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সুশীল সমাজের মধ্যে ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে এক নতুন সচেতনতা তৈরি হয়েছে। এই সচেতনতা থেকেই আন্তর্জাতিক সহায়তার পথ সুগম হয়েছে, যেখানে বিশ্বব্যাংক এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আসছে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব বহুমুখী। ইতিবাচক দিক হলো, উন্নত প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ফলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও সংরক্ষণে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হচ্ছে। মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর, ওয়ারী-বটেশ্বর-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে খননকার্য ও সংরক্ষণে অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য উদঘাটিত হচ্ছে, যা জাতীয় পরিচয় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নেতিবাচক দিক হলো, অপর্যাপ্ত জনবল এবং প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের অভাব এখনও এই খাতের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পেলেও, তা পরিচালনা করার মতো দক্ষ কর্মী বাহিনীর অভাব প্রকট। এছাড়া, অবৈধ প্রত্নবস্তু পাচার এবং স্থানীয়ভাবে প্রত্নস্থান দখলের প্রবণতাও ঐতিহ্য সংরক্ষণের পথে বড় বাধা। বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় বিভিন্ন নীতি ও প্রকল্প গ্রহণ করলেও, সেগুলোর বাস্তবায়ন গতি এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর সংরক্ষণ ও উন্নয়নে সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিনিয়োগের একটি চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
| বছর | মোট সরকারি বরাদ্দ (প্রত্নতত্ত্ব খাত) | বিশ্বব্যাংক/এডিবি সহায়তা (মিলিয়ন USD) | সংরক্ষিত প্রত্নস্থলের সংখ্যা (প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর) | পর্যটক বৃদ্ধি (ঐতিহাসিক স্থানে, %) |
|---|---|---|---|---|
| ২০১৮-১৯ | ১০০ কোটি টাকা | ১০ | ৪৫২ | ৫% |
| ২০১৯-২০ | ১১০ কোটি টাকা | ১২ | ৪৫৫ | ৭% |
| ২০২০-২১ | ১০০ কোটি টাকা | ৮ | ৪৫৬ | -২০% (কোভিড-১৯ প্রভাব) |
| ২০২১-২২ | ১২০ কোটি টাকা | ১৫ | ৪৫৭ | ১৫% |
| ২০২২-২৩ | ১৪০ কোটি টাকা | ২০ | ৪৬১ | ২০% |
| ২০২৩-২৪ (প্রাক্কলিত) | ১৬০ কোটি টাকা | ৫০ | ৪৬৩ | ২৫% |
উৎস: সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) বার্ষিক প্রতিবেদন।
সুপারিশ
- প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং গবেষণায় সক্ষম করে তুলতে নিয়মিত বাজেট বাড়ানো এবং অন্তত ৫০০ দক্ষ প্রত্নতত্ত্ববিদ ও সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ নিয়োগের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা।
- অবৈধ প্রত্নবস্তু পাচার রোধে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি), পুলিশ এবং শুল্ক বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে একটি আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক টাস্কফোর্স গঠন এবং 'প্রত্নসম্পদ আইন, ১৯৬৮' (সংশোধিত) এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
- স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রত্যেক সংরক্ষিত প্রত্নস্থলের জন্য একটি 'স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ কমিটি' গঠন করা, যার অনুমোদন ও তদারকি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় করবে এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এডিবি’র অর্থায়নে কমিউনিটি-ভিত্তিক ঐতিহ্য পর্যটন মডেলের পাইলট প্রকল্প চালু করা।