সম্প্রতি, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, গত পাঁচ বছরে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে পদ্মা, যমুনা এবং ব্রহ্মপুত্র নদের ভয়াবহ ভাঙনে অন্তত ২২টি চিহ্নিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ও স্থাপনা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার কায়েমি জমিদার বাড়ি, পাবনার চাটমোহরের প্রাচীন মসজিদ এবং কুড়িগ্রামের উলিপুরের প্রত্নতাত্ত্বিক টিলা অন্যতম, যা দেশের ঐতিহ্য সংরক্ষণে এক নতুন এবং গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে। এই বিলীন হয়ে যাওয়া নিদর্শনগুলো কেবল ইটের স্তূপ ছিল না, বরং হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সভ্যতার নীরব সাক্ষী ছিল, যা এখন কেবল স্মৃতির পাতায় সীমাবদ্ধ।
নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী ভাঙন একটি নিত্যনৈমিত্তিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের উপর এর প্রভাব ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর যদিও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান চিহ্নিতকরণ ও সংরক্ষণে কাজ করে, নদী ভাঙনের গতিপ্রকৃতি এবং এর আগ্রাসী রূপ তাদের প্রচলিত সংরক্ষণ পদ্ধতির কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। উদাহরণস্বরূপ, যে গতিতে নতুন প্রত্নস্থান আবিষ্কার ও তালিকাভুক্ত হয়, তার চেয়ে দ্রুত গতিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। বিশেষত, ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তন এবং পদ্মার ভাঙন প্রবণতা প্রত্নতাত্ত্বিক মানচিত্র থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থানকে মুছে দিয়েছে, যার ফলে স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কিত গবেষণার সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে। এই ক্ষয়ক্ষতির ফলে শুধুমাত্র ঐতিহাসিক উপকরণই নয়, বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ও ঝুঁকির মুখে পড়ছে, কারণ অনেক নিদর্শনই স্থানীয় লোকগাথা, উৎসব ও জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।
এই সংকট মোকাবেলায় প্রচলিত সংরক্ষণ পদ্ধতিগুলোর দুর্বলতা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে, নদী ভাঙন শুরু হওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে খনন ও স্থানান্তরের কোনো সুসংগঠিত পরিকল্পনা বা পর্যাপ্ত তহবিল থাকে না। World Bank এবং Asian Development Bank (ADB) বাংলাদেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে সহায়তা করলেও, প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে তাদের সরাসরি এবং সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ বা কারিগরি সহায়তা এখনও অপ্রতুল। বাংলাদেশ সরকার নদী ভাঙন প্রতিরোধের জন্য প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে, তবে সেই অর্থায়নে প্রত্নতাত্ত্বিক সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় না। এর ফলে, প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদগুলো অরক্ষিত অবস্থায় থেকে যায় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সহজ শিকারে পরিণত হয়। প্রত্নতত্ত্ব আইন, ১৯৬৮ অনুযায়ী প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান সংরক্ষণের বিধান থাকলেও, তা মূলত খনন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের উপর জোর দেয়, কিন্তু নদী ভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষার জন্য অগ্রিম পদক্ষেপ বা জরুরি ব্যবস্থাপনার দিকটি ততটা শক্তিশালী নয়।
| বছর | শনাক্তকৃত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান | নদী ভাঙনে বিলীন/ক্ষতিগ্রস্ত স্থান | পুনরুদ্ধার/স্থানান্তরকৃত নিদর্শন (%) | সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ (কোটি টাকা - প্রত্নতত্ত্ব) |
|---|---|---|---|---|
| ২০১৯ | ৫৬২ | ৩ | ১০% | ৫.২০ |
| ২০২০ | ৫৭৮ | ৫ | ১২% | ৬.৫০ |
| ২০২১ | ৫৯৫ | ৭ | ৮% | ৬.৮০ |
| ২০২২ | ৬১৩ | ৮ | ৫% | ৭.১০ |
| ২০২৩ | ৬২৭ | ৯ | ৪% | ৭.৩০ |
উৎস: প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বাংলাদেশ সরকার এবং জাতীয় বাজেট প্রতিবেদন (২০১৯-২০২৩)
সুপারিশ
- সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সমন্বিত 'নদী ভাঙন প্রতিরোধ ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সুরক্ষা সেল' গঠন করা উচিত। এই সেল বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (FFWC) থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে নদীভাঙন প্রবণ এলাকায় অবস্থিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর জন্য একটি জরুরি সুরক্ষা পরিকল্পনা (Emergency Preservation Plan) তৈরি করবে, যার মধ্যে দ্রুত খনন ও স্থানান্তর প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
- World Bank এবং ADB-এর চলমান নদী ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কর্মসূচিতে প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট উপ-প্রকল্প (Sub-project) অন্তর্ভুক্ত করতে বাংলাদেশ সরকার জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাবে। এই উপ-প্রকল্পের আওতায় নদী ভাঙনপ্রবণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর জন্য উন্নত ভূ-প্রযুক্তিগত সমীক্ষা, ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন এবং প্রয়োজনে সরেজমিনে সুরক্ষামূলক অবকাঠামো নির্মাণে তহবিল ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।
- প্রত্নতত্ত্ব আইন, ১৯৬৮-কে যুগোপযোগী করে 'প্রত্নতত্ত্ব (সংশোধন) আইন, ২০২৩' প্রণয়ন করা উচিত, যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশেষত নদী ভাঙন থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সুরক্ষার জন্য সুস্পষ্ট ধারা সংযুক্ত থাকবে। এই আইনে নদী ভাঙনের আশঙ্কায় থাকা প্রত্নস্থানগুলো চিহ্নিতকরণ, অগ্রাধিকার তালিকা প্রণয়ন, জরুরি তহবিল গঠন এবং স্থানীয় প্রশাসনকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাথে সমন্বয় করে কাজ করার আইনি বাধ্যবাধকতা অন্তর্ভুক্ত করা হবে।