বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১: বাণিজ্যিক সক্ষমতার চ্যালেঞ্জ ও আগামীর সম্ভাবনা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১: বাণিজ্যিক সক্ষমতার চ্যালেঞ্জ ও আগামীর সম্ভাবনা

জাহিদ হাসান  avatar   
জাহিদ হাসান
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১: বাণিজ্যিক সক্ষমতার চ্যালেঞ্জ ও আগামীর সম্ভাবনা
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১: বাণিজ্যিক সক্ষমতার চ্যালেঞ্জ ও আগামীর সম্ভাবনা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল) কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ (বিএস-১) এর ট্রান্সপন্ডার ব্যবহার সক্ষমতা এখন...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল) কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ (বিএস-১) এর ট্রান্সপন্ডার ব্যবহার সক্ষমতা এখনো প্রায় ৫০ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে, যা এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনার পূর্ণ সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ২০১৮ সালের ১২ই মে সফল উৎক্ষেপণের পর থেকে, দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সম্প্রচার, ডি-টিএইচ (ডাইরেক্ট-টু-হোম) সেবা, এবং ব্যাংক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের ভি-স্যাট (ভেরি স্মল অ্যাপারচার টার্মিনাল) সংযোগ স্থাপনে বিএস-১ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখলেও, আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে, বিএসসিএল ভুটান, নেপাল, ফিলিপাইনসহ কয়েকটি দেশের সাথে বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনে ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে, যা স্যাটেলাইটটির সম্পূর্ণ আর্থিক উপযোগিতা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর বাণিজ্যিক সক্ষমতার মূল ভিত্তি হলো এর ৪০টি কেইউ-ব্যান্ড ও সি-ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডার, যার মধ্যে ২৬টি দেশীয় ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত এবং বাকি ১৪টি আন্তর্জাতিক লিজের জন্য উন্মুক্ত। প্রাথমিক পর্যায়ে, দেশের অভ্যন্তরে ডি-টিএইচ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান আকাশ ডিটিএইচ, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও অন্যান্য বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলসমূহ বিএস-১ এর ট্রান্সপন্ডার ব্যবহার শুরু করে। এরপর, ব্যাংক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ও ডেটা স্থানান্তরের জন্য ভি-স্যাট সেবা গ্রহণ করলেও, এই ব্যবহারের হার এখনো আশানুরূপ নয়। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে ট্রান্সপন্ডার লিজ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিএসসিএলকে তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে যেখানে থাইল্যান্ডের থাইকম, মালয়েশিয়ার অ্যাস্ট্রোনট, এবং ভারতের ইনস্যাট-এর মতো প্রতিষ্ঠিত স্যাটেলাইট অপারেটরদের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। এই তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে, বিএস-১ এর সিগন্যাল কভারেজ ও সেবার মান বজায় রেখে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণ করা একটি জটিল কাজ, যা বিএসসিএল-কে নিরন্তরভাবে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং বিটিআরসি-এর নীতিগত সহায়তা সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক বাজার অনুসন্ধানে আরও আগ্রাসী কৌশল এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন অপরিহার্য।

আগামী দিনের সম্ভাবনাগুলো বিএস-১ এর বাণিজ্যিক সাফল্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্পেস-টেক খাতে বৈশ্বিক প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, রিমোট সেন্সিং, ইন্টারনেট অফ থিংস (আইওটি), এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রগুলোতে স্যাটেলাইট ডেটার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো) এর সাথে বিএসসিএল-এর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বিএস-১ এর সক্ষমতাকে কৃষি, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, এবং সমুদ্র সম্পদ ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রগুলোতে ব্যবহার করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস আরও নির্ভুল করতে বিএস-১ এর সি-ব্যান্ড ডেটা কাজে লাগানো সম্ভব। এছাড়াও, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে ফাইবার অপটিক্যাল সংযোগ পৌঁছানো সম্ভব নয়, সেখানে বিএস-১ এর মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা সম্প্রসারণের বিশাল সুযোগ রয়েছে। বিটিআরসি-এর নীতিগত সমর্থনে এই ধরনের উদ্যোগগুলো গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে এবং ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে, এই সম্ভাবনাগুলোকে বাস্তবে রূপান্তর করতে হলে বিএসসিএলকে কেবল ট্রান্সপন্ডার লিজের বাইরে গিয়ে নতুন ও উদ্ভাবনী স্যাটেলাইট-ভিত্তিক সেবা প্যাকেজ তৈরি করতে হবে, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক গ্রাহকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়। তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা একটি সুদূরপ্রসারী বিনিয়োগ, যার বাণিজ্যিক সাফল্য দেশের সামগ্রিক প্রযুক্তিগত অগ্রগতির জন্য অত্যাবশ্যক।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর বাণিজ্যিক সক্ষমতার চিত্র (২০২৩)
সেবার ক্ষেত্র মোট ট্রান্সপন্ডার ব্যবহার (%) বার্ষিক রাজস্ব (কোটি টাকা) প্রধান ব্যবহারকারী/সেবা
দেশীয় টিভি সম্প্রচার ৩০-৩৫% ৫০-৬০ বিটিভি, বেসরকারি টিভি চ্যানেলসমূহ
ডি-টিএইচ সেবা ৮-১০% ১৫-২০ আকাশ ডিটিএইচ
ভি-স্যাট ও ডেটা কানেক্টিভিটি ৫-৭% ১০-১৫ ব্যাংক, সরকারি প্রতিষ্ঠান, ইন্টারনেট সেবা
আন্তর্জাতিক লিজ ২-৩% ৫-১০ ভূটান (আংশিক), ফিলিপাইন (পরীক্ষামূলক)
মোট ব্যবহারযোগ্য সক্ষমতা ৫০-৫৫% ৮০-১০৫ (অবশিষ্ট ৪০-৪৫% অব্যবহৃত)

উৎস: বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল) এর বার্ষিক প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তথ্য (আনুমানিক)

সুপারিশ

  • বিএসসিএলকে আঞ্চলিক বাজার, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট ও আকর্ষণীয় বাণিজ্যিক প্যাকেজ তৈরি করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (ITU) এর মানদণ্ড অনুসরণ করে সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে থাইকম বা ইনস্যাট-এর মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে প্রতিযোগিতা করা যায়।
  • ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং স্পারসো-এর যৌথ তত্ত্বাবধানে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর ডেটা ব্যবহার করে কৃষি, মৎস্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ পর্যবেক্ষণ খাতে নতুন অ্যাপ্লিকেশন তৈরি ও বাণিজ্যিকীকরণের জন্য একটি গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) সেল গঠন করা উচিত, যা দেশের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে কাজে লাগাবে।
  • বিটিআরসি-কে এমন একটি নীতি কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে যা দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট এবং অন্যান্য টেলিযোগাযোগ সেবা সম্প্রসারণের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা প্রদান করবে এবং এই ধরনের সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহিদ হাসান

জাহিদ হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও স্পেস-টেক। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator