সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২২ অনুযায়ী, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ মোট বাজেটের ১ শতাংশেরও কম, যা দেশের গবেষণা ক্ষেত্রকে ক্রমশ পিছিয়ে দিচ্ছে এবং ফলস্বরূপ মেধাবী গবেষকদের বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রবণতা বাড়িয়ে তুলছে। এই ভয়াবহ চিত্র কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির পথে এক নীরব ঘাতক। প্রতি বছর উচ্চশিক্ষা শেষ করে অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী উন্নত গবেষণা সুবিধা ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের আশায় পশ্চিমা দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন, যা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য এক অশনি সংকেত।
বাংলাদেশের গবেষণা ক্ষেত্র পিছিয়ে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ হলো গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ। দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (GDP)-এর মাত্র ০.১৫% এরও কম গবেষণা খাতে ব্যয় করা হয়, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই এই হার ০.৫% থেকে ১% এর বেশি। এই স্বল্প বরাদ্দ গবেষণা অবকাঠামো, আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশনার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদানে বড় বাধা সৃষ্টি করে। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর যে সংখ্যক পিএইচডি ডিগ্রিধারী বের হচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই দেশে পর্যাপ্ত সুযোগ না পেয়ে বিদেশে উচ্চতর গবেষণা ও কর্মসংস্থানের দিকে ঝুঁকছেন। ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) বারবার দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপর জোর দিলেও, গবেষণার অভাবে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও উদ্ভাবনী দক্ষতা বিকাশের পথ রুদ্ধ হচ্ছে, যা NSDA-এর লক্ষ্য পূরণেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
মেধা পাচারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উচ্চশিক্ষিত কারিগরি ও বৃত্তিমূলক পেশাদারদের বিদেশ গমন। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর বিভিন্ন প্রকল্প যেমন স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SEIP) এর মাধ্যমে দেশে দক্ষ জনশক্তি তৈরির চেষ্টা করছে। তবে, কারিগরি গবেষণায় দুর্বলতা এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তির অভাব এই খাতের পেশাদারদের বিদেশে উন্নত সুযোগ খুঁজতে বাধ্য করছে। উদাহরণস্বরূপ, উন্নত দেশগুলোতে যে ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষণা ও উন্নয়ন কাজ চলে, বাংলাদেশে তার অভাব প্রকট। এই সীমাবদ্ধতা দেশের শিল্প ও কৃষি খাতে নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন প্রয়োগের সুযোগ সীমিত করে দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ব্যাহত করে। BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) এর তথ্য অনুযায়ী, STEM (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতি বছর বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন, যা দেশের গবেষণা ও শিল্প খাতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
| সূচক | বাংলাদেশ (২০২২) | ভারত (২০২২) | পাকিস্তান (২০২২) | শ্রীলঙ্কা (২০২২) |
|---|---|---|---|---|
| জিডিপি'র শতাংশ হিসেবে গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) ব্যয় | ০.১৫% | ০.৭% | ০.৩% | ০.১৩% |
| প্রতি মিলিয়ন জনসংখ্যায় গবেষকের সংখ্যা | ৮২ | ২৫৫ | ১০০ | ৮৫ |
| আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা (প্রতি বছর) | প্রায় ৪,৫০০ | প্রায় ১,৫০,০০০ | প্রায় ৬,০০০ | প্রায় ১,২০০ |
| উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মোট বাজেটের গবেষণা খাতে বরাদ্দ | < ১% | ৬-৮% | ২-৩% | ১-২% |
উৎস: UNESCO Institute for Statistics (UIS), UGC Bangladesh Annual Report 2022, World Bank Data.
সুপারিশ
- গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে জিডিপি'র কমপক্ষে ১% বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে, জাতীয় বাজেট প্রণয়নের সময় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইউজিসি-কে পর্যাপ্ত তহবিল প্রদান নিশ্চিত করতে হবে, যা গবেষণা অবকাঠামো নির্মাণ ও আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপনে ব্যয় করা হবে।
- মেধাবী গবেষকদের জন্য আকর্ষণীয় ফেলোশিপ ও গবেষণা অনুদান চালু করতে হবে। এজন্য ইউজিসি-কে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় প্রতি বছর কমপক্ষে ৫০০টি পিএইচডি ও পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপ চালু করতে হবে এবং এসব ফেলোশিপের আর্থিক মূল্য আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি রাখতে হবে, যাতে বিদেশমুখী প্রবণতা হ্রাস পায়।
- কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা খাতে গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে হবে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং SEIP-কে যৌথভাবে শিল্প-শিক্ষা সহযোগিতামূলক গবেষণা প্রকল্প চালু করতে হবে এবং এসব প্রকল্পের জন্য প্রতি বছর কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে হবে, যাতে শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী নতুন প্রযুক্তি ও দক্ষতা তৈরি হয় এবং দেশের অভ্যন্তরেই উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।