ইডটেক (EdTech) ও অনলাইন এডুকেশন: প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা কার্যকর? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ইডটেক (EdTech) ও অনলাইন এডুকেশন: প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা কার্যকর?

ফারিহা আফরিন  avatar   
ফারিহা আফরিন
ইডটেক (EdTech) ও অনলাইন এডুকেশন: প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা কার্যকর?
ইডটেক (EdTech) ও অনলাইন এডুকেশন: প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা কার্যকর?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি ছাড়িয়েছে। এ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি ছাড়িয়েছে। এই পরিসংখ্যান একদিকে যেমন ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে, তেমনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্যের এক জটিল বাস্তবতাকেও উন্মোচন করে। বিশেষ করে, শিক্ষাক্ষেত্রে ইডটেক (EdTech) এবং অনলাইন শিক্ষা যখন প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থার পরিপূরক বা বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, তখন এই বিশাল সংখ্যক ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অংশগ্রহণ এবং এর কার্যকারিতা গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

ইডটেক প্ল্যাটফর্মগুলো ভৌগোলিক দূরত্ব ঘুচিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কাছে মানসম্মত শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার এক অপার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) এর তথ্য মতে, দেশীয় ইডটেক স্টার্টআপগুলোর সংখ্যা বর্তমানে ৩০০ ছাড়িয়েছে, যা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ডিজিটাল শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে। তবে, এসব উদ্ভাবনী উদ্যোগের সুফল প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে গিয়ে বেশ কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। যেমন, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগের অভাব, স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের মতো প্রয়োজনীয় ডিভাইসের স্বল্পতা এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যেসকল পরিবারে একটিমাত্র স্মার্টফোন থাকে, সেটিতে শিক্ষার চেয়ে অন্যান্য বিনোদনমূলক ব্যবহারের প্রবণতাই বেশি। উপরন্তু, অনলাইন শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং কারিগরি সহায়তা প্রান্তিক অঞ্চলে এখনো অপ্রতুল, যা শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে।

ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সরকারের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রামের 'মুক্তপাঠ' বা 'আমার ঘরে আমার স্কুল' এর মতো উদ্যোগগুলো প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলো শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরিতে সহায়তা করছে। তবে, এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা মূল্যায়নে দেখা গেছে যে, কন্টেন্টের স্থানীয়করণ এবং শিক্ষাপদ্ধতির বৈচিত্র্য প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য আরও প্রাসঙ্গিক হওয়া প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, হাওর, চর বা পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জীবনধারা ও ভাষাগত ভিন্নতাকে বিবেচনা করে শিক্ষাপদ্ধতি তৈরি না হলে তাদের জন্য তা ততটা কার্যকর হয় না। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ) ইডটেক স্টার্টআপগুলোকে বিভিন্ন ইনকিউবেশন ও ফান্ডিং সহায়তা দিলেও, এই সহায়তার একটি বড় অংশ শহরাঞ্চলে কেন্দ্রীভূত, যেখানে প্রান্তিক অঞ্চলের জন্য বিশেষায়িত উদ্যোগগুলো অনেক সময় পর্যাপ্ত সমর্থন পায় না।

এছাড়াও, অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা ধরে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথাগত শ্রেণীকক্ষের মতো মুখোমুখি মিথস্ক্রিয়া না থাকায় অনেক শিক্ষার্থীই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (আইসিটি ডিভিশন) ডিজিটাল লিটারেসি বাড়াতে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিলেও, প্রান্তিক স্তরে এর বাস্তবায়ন এখনো ধীর গতিতে চলছে। শিক্ষকের প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীর ডিভাইস প্রাপ্তি এবং উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি না হলে কেবল ডিজিটাল কন্টেন্ট সরবরাহ করে শিক্ষাব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ভিত্তিক ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষার সম্ভাবনা থাকলেও, এর জন্য যে পরিমাণ ডেটা ও অবকাঠামো প্রয়োজন, তা প্রান্তিক পর্যায়ে এখনো অধরা। ফলস্বরূপ, ইডটেকের পূর্ণ সুফল পেতে হলে সামগ্রিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন, স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী কন্টেন্ট তৈরি এবং ডিজিটাল বৈষম্য দূরীকরণে আরও সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।

প্রতিষ্ঠানের নাম ভূমিকা/প্রকল্প প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য বর্তমান অবস্থা
BTRC ইন্টারনেট সংযোগ সরবরাহ ও নীতিমালা প্রণয়ন দেশের ১৩ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে, গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এখনও সীমিত (২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায় ব্রডব্যান্ড প্রবেশাধিকার প্রায় ৪০%)।
BASIS দেশীয় ইডটেক স্টার্টআপ উন্নয়ন ও প্রচার ৩০০+ ইডটেক স্টার্টআপের মধ্যে, ১০% এরও কম স্টার্টআপ সরাসরি প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষায়িত সমাধান নিয়ে কাজ করছে।
ICT Division ডিজিটাল লিটারেসি ও অবকাঠামো উন্নয়ন 'লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট' এর মাধ্যমে ১ লাখের বেশি তরুণকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও, প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতার হার এখনও জাতীয় গড়ের (৭০%) চেয়ে ১৫-২০% কম।
a2i শিক্ষামূলক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম (মুক্তপাঠ, আমার ঘরে আমার স্কুল) 'মুক্তপাঠ' প্ল্যাটফর্মে প্রায় ৫ মিলিয়ন ব্যবহারকারী থাকলেও, প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষকদের জন্য প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার ও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেটের অভাবে কন্টেন্ট ব্যবহার প্রায় ৩০% কম।
BHTPA হাই-টেক পার্ক ও স্টার্টআপ ইনকিউবেশন ৬টি হাই-টেক পার্কের মাধ্যমে প্রায় ৬০০+ স্টার্টআপকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে, তবে প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা শিক্ষার্থীদের জন্য সরাসরি উদ্ভাবনী ইডটেক সমাধান তৈরির ক্ষেত্রে এই সহায়তা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও ডিজিটাল কন্টেন্ট অনুমোদন ২০২৩ সালের নতুন শিক্ষাক্রম ডিজিটাল কন্টেন্ট ভিত্তিক হলেও, প্রায় ২৫% গ্রামীণ স্কুলে প্রয়োজনীয় মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম বা অভিজ্ঞ শিক্ষক নেই।

উৎস: BTRC বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২৩), BASIS ইডটেক ফোরাম প্রতিবেদন (২০২৩-২৪), ICT Division ও a2i প্রকল্প মূল্যায়ন প্রতিবেদন (২০২২-২৩), BHTPA বার্ষিক পরিকল্পনা (২০২৩-২৪), শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউনেস্কো প্রতিবেদন (২০২৩)।

সুপারিশ

  • বিটিআরসি এবং আইসিটি ডিভিশনকে সমন্বিতভাবে 'ডিজিটাল গ্রাম' (Digital Village) প্রকল্প চালু করতে হবে, যার আওতায় ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট এবং সুলভ মূল্যে স্মার্ট ডিভাইস বিতরণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও বাজেট বরাদ্দ করতে হবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং a2i-কে যৌথভাবে একটি 'প্রান্তিক শিক্ষা কন্টেন্ট উন্নয়ন তহবিল' গঠন করতে হবে, যা আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক ডিজিটাল শিক্ষামূলক উপকরণ তৈরিতে BASIS-এর তালিকাভুক্ত ইডটেক স্টার্টআপগুলোকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করবে এবং প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি 'ডিজিটাল লার্নিং হাব' স্থাপন করবে।
  • BHTPA-কে তাদের ইনকিউবেশন প্রোগ্রামের অধীনে 'ইডটেক ফর অল' (EdTech for All) নামক একটি বিশেষ উইং চালু করতে হবে, যেখানে প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য কম খরচে টেকসই ডিজিটাল সমাধান তৈরিতে আগ্রহী স্টার্টআপগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনিয়োগ, মেন্টরশিপ এবং গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) সহায়তা প্রদান করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারিহা আফরিন

ফারিহা আফরিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ইডটেক (EdTech) ও অনলাইন এডুকেশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator