জাতীয় গ্রিডের দুর্বলতা ও জ্বালানির আমদানি নির্ভরতা: টেকসই সমাধান কোথায়? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জাতীয় গ্রিডের দুর্বলতা ও জ্বালানির আমদানি নির্ভরতা: টেকসই সমাধান কোথায়?

প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম  avatar   
প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম
জাতীয় গ্রিডের দুর্বলতা ও জ্বালানির আমদানি নির্ভরতা: টেকসই সমাধান কোথায়?
জাতীয় গ্রিডের দুর্বলতা ও জ্বালানির আমদানি নির্ভরতা: টেকসই সমাধান কোথায়?
ছবি: সংগৃহীত
গত বছর ৪ অক্টোবর ২০২২-এ জাতীয় গ্রিডে আকস্মিক বিপর্যয় সারাদেশকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়েছিল প্রায় সাত ঘণ্টা। এই ঘটনা কেবল একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি ছিল না, বরং...

গত বছর ৪ অক্টোবর ২০২২-এ জাতীয় গ্রিডে আকস্মিক বিপর্যয় সারাদেশকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়েছিল প্রায় সাত ঘণ্টা। এই ঘটনা কেবল একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি ছিল না, বরং বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত দুর্বলতা এবং জ্বালানি আমদানিনির্ভরতার চরম বাস্তবতাকে প্রকটভাবে উন্মোচন করে দেয়। সেই সময় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে গঠিত তদন্ত কমিটি গ্রিড বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে সঞ্চালন লাইনের দুর্বলতা এবং উৎপাদন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বয়হীনতাকে চিহ্নিত করে। এই বিপর্যয় দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৩০ বিলিয়ন টাকার সমপরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়েছিল বলে প্রাথমিক হিসাব থেকে জানা যায়, যার মধ্যে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে যাওয়া অন্যতম।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা কাগজে-কলমে প্রায় ২৮,০০০ মেগাওয়াটের বেশি হলেও, পিক আওয়ারে সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা ১৫,০০০ মেগাওয়াট অতিক্রম করতে পারেনি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। এর প্রধান কারণ হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারা এবং উচ্চ সিস্টেম লস। বর্তমানে, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৭৬ শতাংশই আসে গ্যাস, ফার্নেস তেল ও ডিজেল থেকে, যার একটি বৃহৎ অংশ আমদানি নির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং অন্যান্য বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সংস্থাগুলোকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে। World Bank-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে ভর্তুকি প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা দেশের উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অধিকন্তু, LNG (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানির জন্য স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা অপ্রত্যাশিত মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

জাতীয় গ্রিডের দুর্বলতা নিরসনে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিলেও তার বাস্তবায়ন ধীরগতিতে হচ্ছে। বিশেষ করে, সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের আধুনিকীকরণ এবং স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি স্থাপনের প্রকল্পগুলো প্রত্যাশিত গতি পায়নি। ADB (Asian Development Bank) থেকে প্রাপ্ত ঋণ সহায়তায় বেশ কিছু উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সঞ্চালন লাইন নির্মাণ প্রকল্প চলমান থাকলেও, সেগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে না পারায় গ্রিডের সক্ষমতা বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) দ্বারা পরিচালিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সঞ্চালন লাইন উন্নয়ন প্রকল্প, যা ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে বিদ্যুৎ প্রবাহকে শক্তিশালী করার কথা, তা ২০২৫ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে গেছে। পাশাপাশি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসার লক্ষ্য থাকলেও, বর্তমানে তা মাত্র ১০ শতাংশের কাছাকাছি। সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ এবং প্রাথমিক বিনিয়োগ সংক্রান্ত জটিলতা এই খাতের অগ্রগতিতে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।

জ্বালানি উৎস ২০১৮ সালে মোট উৎপাদনে অংশ (%) ২০২৩ সালে মোট উৎপাদনে অংশ (%) সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যমাত্রা (২০৩০ সাল)
প্রাকৃতিক গ্যাস ৫৬% ৪৮% ৩০%
ফার্নেস তেল ও ডিজেল ৩০% ২৮% ১৫%
কয়লা (আমদানি) ৭% ১৪% ২৫%
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ১% ৩% ২০%
পারমাণবিক ০% ২% ১০%

উৎস: বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB) এবং World Bank-এর প্রতিবেদন

সুপারিশ

  • বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে জাতীয় গ্রিডের সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে ADB এবং World Bank-এর সহায়তায় গৃহীত প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বিশেষত, "স্মার্ট গ্রিড রোডম্যাপ" অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ৩০% সঞ্চালন লাইনকে স্মার্ট গ্রিডের আওতায় আনতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক "নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০০৮" (সংশোধিত) এর আওতায় সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বাস্তবায়নের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে, যাতে ২০৪১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ৪০% বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়।
  • পেট্রোবাংলাকে দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় টার্মস ও কন্ডিশনস সহ নতুন বিডিং রাউন্ড চালু করতে হবে, যা জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম

প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি সংকট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator