ইডটেক (EdTech) ও অনলাইন এডুকেশন: প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা সুগম? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ইডটেক (EdTech) ও অনলাইন এডুকেশন: প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা সুগম?

ফারিহা আফরিন  avatar   
ফারিহা আফরিন
ইডটেক (EdTech) ও অনলাইন এডুকেশন: প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা সুগম?
ইডটেক (EdTech) ও অনলাইন এডুকেশন: প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা সুগম?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) কর্তৃক প্রকাশিত 'স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১: রোডম্যাপ ও বাস্তবায়ন কৌশল' শীর্ষক দলিলে ডিজ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) কর্তৃক প্রকাশিত 'স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১: রোডম্যাপ ও বাস্তবায়ন কৌশল' শীর্ষক দলিলে ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থার রূপান্তরের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এই রোডম্যাপে অনলাইন শিক্ষাকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বিশেষত, প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল শিক্ষার সুগম্যতা নিশ্চিত করাকে একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারীর সময় অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থার অপরিহার্যতা স্পষ্ট হলেও, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা, ডিজিটাল ডিভাইস ক্রয়ক্ষমতা এবং পর্যাপ্ত ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবে দেশের একটি বিশাল অংশ, বিশেষ করে গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীরা এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, ইডটেক (EdTech) এবং অনলাইন শিক্ষা কীভাবে প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য আরও সুগম করা যায়, তা নিয়ে একটি গভীর বিশ্লেষণ এখন সময়ের দাবি।

ইডটেক খাতের দ্রুত প্রসার নিঃসন্দেহে শিক্ষাব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশের ইডটেক স্টার্টআপগুলোর সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রায় ৫০টিরও বেশি সক্রিয় প্ল্যাটফর্ম নিয়ে কাজ করছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলো বিভিন্ন বয়স ও স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন কোর্স, টিউটোরিয়াল এবং ইন্টারেক্টিভ লার্নিং টুলস সরবরাহ করছে। তবে, এসব প্ল্যাটফর্মের সিংহভাগই শহরকেন্দ্রিক এবং উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে তৈরি হয়েছে। প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষায়িত বিষয়বস্তু, আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ এবং কম ব্যান্ডউইথে ব্যবহার উপযোগী সমাধান তৈরির ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৩.৯৭ কোটি হলেও, এর মধ্যে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম এবং মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ স্বল্প ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করে। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, কেবল ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই হবে না, বরং মানসম্মত এবং সাশ্রয়ী ইন্টারনেট সংযোগের অভাব প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের অনলাইন শিক্ষায় অংশগ্রহণের পথে একটি বড় বাধা।

প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন শিক্ষার সুগম্যতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল অবকাঠামোর পাশাপাশি ডিজিটাল সাক্ষরতা ও ডিভাইস সহজলভ্যতা অত্যাবশ্যক। অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত বিভিন্ন পাইলট প্রজেক্টে দেখা গেছে, কেবল ইন্টারনেট সংযোগ দিলেই শিক্ষার্থীরা তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছে না। ডিজিটাল ডিভাইস যেমন স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা ট্যাবলেটের অভাব এবং এই ডিভাইসগুলো ব্যবহারের প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) দেশের বিভিন্ন স্থানে হাই-টেক পার্ক স্থাপনের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করলেও, এর সুফল এখনো প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থায় তেমন পৌঁছায়নি। স্থানীয় পর্যায়ে ডিজিটাল লার্নিং সেন্টার স্থাপন, বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে ডিভাইস বিতরণ এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই ব্যবধান কমানো সম্ভব। এছাড়া, অনলাইন শিক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং এর নিরবচ্ছিন্নতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা গ্রামীণ এবং দুর্গম এলাকায় প্রায়শই অনুপস্থিত থাকে।

সূচক ২০১৯ সাল ২০২৩ সাল উৎস
ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (কোটি) ১০.৩২ ১৩.৯৭ BTRC
ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (কোটি) ০.৮৯ ১.২৬ BTRC
মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (কোটি) ৯.৪৩ ১২.৭১ BTRC
ডিজিটাল সাক্ষরতার হার (১৫-৬৪ বছর) ৩৫% ৫৮% a2i (জাতীয় ডিজিটাল সাক্ষরতা সমীক্ষা)

উৎস: বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC) এবং অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC) গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নীতিমালা প্রণয়ন করবে এবং মোবাইল অপারেটরদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট প্যাকেজ চালু করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করবে, বিশেষ করে শিক্ষা প্যাকেজের ক্ষেত্রে ডেটা চার্জ সর্বনিম্ন স্তরে রাখা হবে।
  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) যৌথভাবে একটি জাতীয় ডিজিটাল ডিভাইস বিতরণ কর্মসূচি চালু করবে, যেখানে প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তুকি মূল্যে বা বিনামূল্যে লার্নিং ডিভাইস (যেমন ট্যাবলেট বা ল্যাপটপ) সরবরাহ করা হবে এবং বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) এর আওতাধীন হাই-টেক পার্কগুলোতে স্থানীয়ভাবে এসব ডিভাইস তৈরির উদ্যোগকে উৎসাহিত করবে।
  • বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এর সহায়তায় ইডটেক স্টার্টআপগুলোকে প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের উপযোগী কনটেন্ট তৈরি এবং স্থানীয় ভাষায় শিক্ষামূলক উপকরণ বিকাশে বিশেষ প্রণোদনা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হবে, যা কম ব্যান্ডউইথেও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারিহা আফরিন

ফারিহা আফরিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ইডটেক (EdTech) ও অনলাইন এডুকেশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator