সাম্প্রতিক সময়ে 'আমার স্কুল' বা 'মুক্তপাঠ'-এর মতো সরকারি প্ল্যাটফর্মগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা 'শিক্ষক.কম' বা 'টেন মিনিট স্কুল'-এর মতো এডটেক (EdTech) প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যাপক প্রসারে এটি স্পষ্ট যে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এক ডিজিটাল বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। করোনাকালীন বৈশ্বিক মহামারীকালে যখন প্রচলিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ছিল, তখন এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোই শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন সচল রাখতে এক অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ডিজিটাল সুযোগ কি সবার দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারছে? নাকি এটি বিদ্যমান ডিজিটাল বিভাজনকে আরও বাড়িয়ে তুলছে? এই প্রশ্নগুলোই আজ আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) বিভাগের 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' রূপকল্পের অধীনে a2i (অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন) প্রোগ্রাম নিরলসভাবে শিক্ষাকে ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তাদের 'শিক্ষক বাতায়ন' এবং 'মুক্তপাঠ' প্ল্যাটফর্মগুলো শিক্ষকদের অনলাইন প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে মানসম্মত অনলাইন কোর্স প্রদান করে শিক্ষার সুযোগকে গণতান্ত্রিক করার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই উদ্যোগগুলো গ্রামীণ ও শহর অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষাগত বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থা প্রায়শই ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা এবং সম্পদের অভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। এই প্ল্যাটফর্মগুলো কেবল পাঠ্যক্রম বিতরণই নয়, শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক হচ্ছে, যা সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়নে অপরিহার্য। তবে, এই সুযোগগুলোর পূর্ণ সদ্ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
অন্যদিকে, এডটেক খাতের এই দ্রুত বিকাশ সত্ত্বেও, বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি অংশ এখনও ডিজিটাল বিভাজনের শিকার। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC)-এর তথ্য অনুযায়ী, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়লেও, গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগের অভাব এবং এর উচ্চ মূল্য একটি বড় বাধা। স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের মতো প্রয়োজনীয় ডিজিটাল ডিভাইসের সহজলভ্যতা এবং ক্রয়ক্ষমতার অভাবও এই বিভাজনকে আরও গভীর করছে। অনেক শিক্ষার্থী, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারের সদস্যরা, অনলাইন শিক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাজেট বা ইন্টারনেট ডেটা কিনতে অক্ষম। এর ফলে, যদিও অনলাইন শিক্ষা সবার জন্য সুযোগের দ্বার খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, বাস্তবক্ষেত্রে এটি একটি নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি করতে পারে, যেখানে প্রযুক্তিগত সুবিধাভোগীরা আরও এগিয়ে যাবে এবং যারা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত, তারা আরও পিছিয়ে পড়বে। এই বৈষম্য দূর করতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য।
বাংলাদেশের সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা খাতের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্য সংগঠন BASIS (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস) স্থানীয় এডটেক স্টার্টআপগুলোকে উৎসাহিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তারা প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষামূলক উদ্ভাবনগুলোকে সমর্থন দিচ্ছে এবং উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সহায়ক ইকোসিস্টেম তৈরিতে কাজ করছে। বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) দেশের বিভিন্ন স্থানে হাইটেক পার্ক স্থাপন করে প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ এবং এডটেক কোম্পানিগুলোর জন্য অবকাঠামোগত সহায়তা প্রদান করছে, যা তাদের গবেষণা ও উন্নয়নে সহায়তা করছে। এই উদ্যোগগুলো এডটেক খাতের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করলেও, এই উদ্ভাবনগুলোর সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দিতে হলে প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী নীতি এবং সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা। শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত উন্নয়নই যথেষ্ট নয়; বরং এই প্রযুক্তিকে কিভাবে সবার জন্য সহজলভ্য ও কার্যকর করা যায়, সেদিকেই এখন মনোযোগ দিতে হবে।
| সূচক | ২০১৯ সাল | ২০২৩ সাল | উন্নতির হার (শতাংশ) |
|---|---|---|---|
| ইন্টারনেট ব্যবহারকারী | ৯.৯ কোটি | ১২.৯ কোটি | ৩০.৩% |
| স্মার্টফোন ব্যবহারকারী | ৪.৩ কোটি | ৭.৫ কোটি | ৭৪.৪% |
| অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী (আনুমানিক) | ৫০ লাখ | ১.৫ কোটি | ২০০% |
| গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট অনুপ্রবেশ | ৪০% | ৬০% | ৫০% |
| এডটেক স্টার্টআপ বিনিয়োগ (মিলিয়ন USD) | ১০ | ৪৫ | ৩৫০% |
উৎস: BTRC, ICT Division এবং বিভিন্ন বেসরকারি এডটেক প্ল্যাটফর্মের প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত আনুমানিক তথ্য।
সুপারিশ
- BTRC-কে নির্দেশ দিতে হবে যেন তারা ২০২৬ সালের মধ্যে দেশের সকল ইউনিয়ন পর্যায়ে উচ্চগতির ফাইবার অপটিক ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করে এবং এর ব্যবহারের খরচ হ্রাস করার জন্য ভর্তুকি নীতি প্রণয়ন করে, যাতে গ্রামীণ শিক্ষার্থীরাও অনলাইন শিক্ষায় নির্বিঘ্নে অংশ নিতে পারে।
- ICT Division-এর অধীনে একটি 'জাতীয় ডিজিটাল শিক্ষা তহবিল' গঠন করতে হবে, যা নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল ডিভাইস (যেমন ট্যাবলেট বা ল্যাপটপ) ক্রয়ে সহায়তা প্রদান করবে এবং a2i প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিনামূল্যে ডিজিটাল সাক্ষরতা প্রশিক্ষণ কর্মসূচির প্রসার ঘটাবে।
- BASIS এবং BHTPA-কে যৌথভাবে একটি 'এডটেক ইনোভেশন হাব' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে স্থানীয় এডটেক স্টার্টআপগুলোকে গবেষণা ও উন্নয়নে আর্থিক অনুদান এবং মেন্টরশিপ প্রদান করা হবে, বিশেষ করে এমন উদ্ভাবনগুলোকে যা ডিজিটাল বিভাজন কমাতে এবং স্থানীয় পাঠ্যক্রমের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ মানসম্মত ডিজিটাল বিষয়বস্তু তৈরিতে সহায়তা করবে।