গত বছর ৪ অক্টোবর, ২০২২ তারিখে দেশের একটি বৃহৎ অংশ, যার মধ্যে রাজধানী ঢাকাও অন্তর্ভুক্ত, আকস্মিকভাবে প্রায় সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন ছিল। এটি ছিল বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিড ব্যবস্থার সাম্প্রতিককালের অন্যতম বৃহৎ বিপর্যয়। প্রাথমিকভাবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এই বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে সঞ্চালন লাইনে ত্রুটি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে অস্বাভাবিক ভারসাম্যহীনতাকে দায়ী করলেও, এই ঘটনা কেবল সাময়িক সরবরাহ ঘাটতির চেয়ে গভীরতর কাঠামোগত দুর্বলতার দিকেই ইঙ্গিত দেয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেও, সেই উৎপাদিত বিদ্যুৎ নির্ভরযোগ্যভাবে গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রিড অবকাঠামোর সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, পুরোনো সঞ্চালন লাইন, প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত আপগ্রেডেশনের ধীরগতি এই ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রশংসনীয় অর্জন। বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই গ্যাস-ভিত্তিক হলেও, কয়লা, তেল এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎসের মিশ্রণও দেখা যাচ্ছে। তবে, এই উৎপাদন সক্ষমতার বৃদ্ধি গ্রিড অবকাঠামোর সমান্তরাল উন্নতি ঘটাতে পারেনি। পিজিসিবি’র তথ্য অনুযায়ী, দেশের অনেক উচ্চ-ভোল্টেজ সঞ্চালন লাইন বহু পুরোনো এবং সেগুলোর ধারণক্ষমতা বর্তমান বিদ্যুৎ প্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উদাহরণস্বরূপ, একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে একই লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার ফলে লোড বেড়ে গিয়ে অনেক সময় ট্রিপিং বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এছাড়াও, সাবস্টেশনগুলোর আধুনিকীকরণ এবং স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তির প্রয়োগে এখনও অনেক পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ খাতে প্রায় ১৫-২০% সিস্টেম লস (কারিগরি ও অ-কারিগরি ক্ষতি) হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এই উচ্চ সিস্টেম লস কেবল আর্থিক ক্ষতিই নয়, গ্রিডের অদক্ষতা ও দুর্বলতারও পরিচায়ক। অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ এবং আধুনিক স্ক্যাডা (SCADA) সিস্টেমের অভাব গ্রিড পরিচালনায় প্রয়োজনীয় রিয়েল-টাইম ডেটা এবং নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সীমিত করে দেয়, যা যেকোনো ছোট ত্রুটিকে দ্রুত বড় বিপর্যয়ে পরিণত করতে পারে।
বিদ্যুৎ গ্রিডের স্থিতিশীলতা রক্ষায় কেবল উৎপাদন সক্ষমতাই যথেষ্ট নয়, বরং সঞ্চালন, বিতরণ এবং লোড ব্যবস্থাপনার একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী ব্যবস্থা অপরিহার্য। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে অর্থায়ন করলেও, তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গ্রিড আধুনিকীকরণ প্রকল্পে অর্থায়ন সত্ত্বেও বাস্তবায়নের ধীরগতি প্রায়শই লক্ষ্য করা যায়। দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে শিল্পায়ন ও নগরায়ণের কারণে। পিক আওয়ারে চাহিদা মেটাতে গিয়ে গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়, যা দুর্বল অবকাঠামোর কারণে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। জ্বালানি বহুমুখীকরণেও চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান; এলএনজি আমদানি নির্ভরতা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে ব্যয়বহুল ও অনির্ভরযোগ্য করে তুলেছে। এর ফলে, অনেক সময় চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও, জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হয় না, যা গ্রিডকে আরও নাজুক করে তোলে। তাছাড়া, লোড-শেডিংয়ের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে, বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনঃস্থাপন প্রক্রিয়াও দুর্বল গ্রিড ব্যবস্থাপনার কারণে দীর্ঘায়িত হয়, যেমনটি ২০২২ সালের অক্টোবরে দেখা গেছে। এই সব বিষয়গুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না হয়ে, বরং একটি দুর্বল ও অসংহত গ্রিড ব্যবস্থার ধারাবাহিক প্রতিফলক হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
| সূচক | ২০১৩ সাল | ২০২২ সাল | উন্নতি/পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা (মেগাওয়াট) | ৯,৭৫৭ | ২৫,২২৭ | ১৫৭% বৃদ্ধি |
| সঞ্চালন লাইন (সার্কিট কিলোমিটার) | ৯,০৭৮ | ১৩,৩১৫ | ৪৬.৭% বৃদ্ধি |
| জনসংখ্যা বিদ্যুতের আওতায় (%) | ৬২ | ১০০ | ৩৮% বৃদ্ধি |
| সিস্টেম লস (সঞ্চালন ও বিতরণ সম্মিলিত, %) | ১৫.৩০ | ১২.০৯ | ৩.২১% হ্রাস |
| গড় বিদ্যুৎ চাহিদা (মেগাওয়াট) | ৬,০০০ | ১২,০০০ | ১০০% বৃদ্ধি (আনুমানিক) |
উৎস: বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি), বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
সুপারিশ
- বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে দ্রুত একটি সমন্বিত গ্রিড আধুনিকীকরণ ও স্থিতিশীলতা নীতি (Integrated Grid Modernization & Stability Policy) প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে আগামী ৫ বছরে অন্তত ৩০% পুরোনো সঞ্চালন লাইন প্রতিস্থাপন এবং সমস্ত সাবস্টেশনকে স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তির আওতায় আনার জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও বাজেট বরাদ্দ থাকবে। এর জন্য পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এবং সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থাগুলোকে (যেমন ডিপিডিসি, ডেসকো, আরইবি) কঠোর জবাবদিহিতার কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
- বাংলাদেশ সরকার এবং বিশ্বব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে চলমান বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর (যেমন – Power System Efficiency Improvement Project) বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে হবে এবং প্রকল্প মনিটরিং ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে আর্থিক বরাদ্দ ও কারিগরি সহায়তা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয় এবং প্রকল্পের উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থতার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়।
- পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)-কে জরুরি ভিত্তিতে একটি অত্যাধুনিক SCADA (Supervisory Control and Data Acquisition) সিস্টেম এবং এনার্জি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (EMS) স্থাপনের জন্য ADB-এর কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যা গ্রিডের রিয়েল-টাইম মনিটরিং, ফল্ট ডিটেকশন এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার জন্য অপরিহার্য, এবং যা ২০২৭ সালের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে কার্যকর করতে হবে।