দলবাজ আমলাতন্ত্র: রাষ্ট্রযন্ত্রের রাজনৈতিক দিন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

দলবাজ আমলাতন্ত্র: রাষ্ট্রযন্ত্রের রাজনৈতিক দিন

শরিফুল খান প্লাবন avatar   
শরিফুল খান প্লাবন
দলবাজ আমলাতন্ত্র: রাষ্ট্রযন্ত্রের রাজনৈতিক দিন
দলবাজ আমলাতন্ত্র: রাষ্ট্রযন্ত্রের রাজনৈতিক দিন
ছবি: সংগৃহীত
****

 

বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এমন এক ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে, যেখানে ক্ষমতা দখল ও রক্ষার প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রযন্ত্র। অথচ সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা আছে— “জনগণের সেবা করা প্রশাসনের পবিত্র দায়িত্ব।” কিন্তু বাস্তব চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন প্রশ্ন জাগে— রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্র কি সত্যিই জনগণের সেবক, নাকি কোনো রাজনৈতিক দলের ‘নির্বাচিত সৈনিক’?

 

আমলাতন্ত্রের মূল ধারণা

 

আমলাতন্ত্র মূলত একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো, যার কাজ সরকারের নীতিমালা বাস্তবায়ন ও জনসেবা নিশ্চিত করা। এটি রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে ন্যায়, দক্ষতা ও নিয়মের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের দেশে এ কাঠামো ক্রমশ দলীয় প্রভাবের জালে জড়িয়ে পড়েছে।

বিশেষ করে ১৯৯০ সালের পর থেকে যে কোনো সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসনে নিজেদের অনুগত কর্মকর্তা নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার শুরু করে। ফলে ধীরে ধীরে প্রশাসনের মধ্যে দলীয় বিভাজন গড়ে ওঠে— কেউ “সরকারপন্থী”, কেউ “বিরোধীপন্থী” কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত হয়ে যান।

 

দলবাজির উৎপত্তি ও বিস্তার

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলীয় প্রভাব নতুন নয়, তবে আমলাতন্ত্রে তার প্রবেশ সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে। প্রশাসনের নিয়োগ থেকে মাঠপর্যায়ের থানা পর্যন্ত— সর্বত্র রাজনৈতিক আনুগত্য এখন অন্যতম যোগ্যতা। একসময় প্রশাসনে পদোন্নতি হতো কর্মদক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও নীতিনিষ্ঠার ভিত্তিতে। এখন তা নির্ভর করছে কে কোন ছাত্ররাজনীতির শাখার ছিলেন, বা কার সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ আছে তার ওপর।ফলাফল হলো— প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নিরপেক্ষতা বিলুপ্ত হচ্ছে, নীতিগত সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক বিবেচনা ঢুকে পড়ছে, এবং রাষ্ট্রযন্ত্র জনগণের নয়, শাসক দলের স্বার্থ রক্ষায় নিয়োজিত হচ্ছে।

 

সাম্প্রতিক বাস্তবতা

 

২০২4 সালের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (TI) ও ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (EIU) এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতি এখন “উচ্চমাত্রায়” পৌঁছেছে। বাংলাদেশের প্রশাসনের প্রায় ৬০% কর্মকর্তা মনে করেন, “রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ পদে যাওয়া কঠিন।”

এমন বাস্তবতায় অনেক যোগ্য ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তা পিছিয়ে পড়ছেন, অথচ দলীয় আনুগত্য প্রদর্শনকারী কর্মকর্তারা দ্রুত পদোন্নতি পাচ্ছেন। এর ফলে প্রশাসনের দক্ষতা যেমন কমছে, তেমনি জনসাধারণের আস্থা হারাচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো।

 

রাষ্ট্রযন্ত্রের রাজনৈতিক ব্যবহার

 

প্রশাসনের দলীয়করণ কেবল পদোন্নতি বা বদলিতে সীমাবদ্ধ নয়— নির্বাচনী ব্যবস্থাপনাও এখন তার শিকার। নির্বাচনকালীন সময় প্রশাসনকে ব্যবহার করে ভোটের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ, প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি, এমনকি প্রশাসনিক ক্ষমতা দিয়ে রাজনৈতিক বার্তা পাঠানোর উদাহরণ বহুবার দেখা গেছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও), জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার— এদের ভূমিকা অনেক সময় নির্বাচনী নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। জনগণ তাই বিশ্বাস হারাচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।

 

ক্ষতির পরিমাণ

 

দলবাজ আমলাতন্ত্র কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেই নয়, অর্থনৈতিক অগ্রগতিকেও বাধাগ্রস্ত করছে। একটি নিরপেক্ষ ও দক্ষ প্রশাসন ছাড়া বিনিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্প কিংবা জনসেবা টেকসই হতে পারে না। দলীয়করণ প্রশাসনের সিদ্ধান্তে পক্ষপাত, দুর্নীতি ও অদক্ষতা বাড়ায়। এতে সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়, এবং জনগণ বঞ্চিত হয় মৌলিক সেবাসমূহ থেকে। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রের গভীর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা তৈরি করে— যেখানে “যোগ্যতা নয়, যোগসূত্রই” হয়ে ওঠে সফলতার মূল চাবিকাঠি।

 

বিশ্লেষণ: কেন এই দলীয়করণ থামছে না?

 

এর পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ রয়েছে—

 

1. ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার মানসিকতা: রাজনীতিবিদরা মনে করেন, প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে রাখলেই শাসন টিকিয়ে রাখা সহজ।

 

 

2. জবাবদিহির অভাব: দুর্নীতি বা পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দুর্লভ।

 

 

3. প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা: প্রশাসন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইত্যাদি সংস্থা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নয়।

 

 

4. দলীয় সংস্কৃতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: দীর্ঘদিন ধরে একটি দল ক্ষমতায় থাকলে প্রশাসনের মধ্যে তাদের প্রভাব স্থায়ী হয়ে যায়।

 

 

 

সমাধানের পথ

 

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কিছু সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—

 

সিভিল সার্ভিস কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করা।

 

নিরপেক্ষ নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি নীতিমালা বাস্তবায়ন।

 

প্রশাসনে রাজনৈতিক আনুগত্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি বন্ধ করা।

 

দুর্নীতি ও দলীয় পক্ষপাতের বিরুদ্ধে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

 

রাজনীতিতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপের পরিবর্তে প্রশাসনে রাজনীতির অনুপ্রবেশ রোধ করা।

 

 

বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র জনগণের ট্যাক্সে চলে— কোনো দলের তহবিলে নয়। তাই আমলাতন্ত্রের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ, রাজনৈতিক আনুগত্য নয়।

দলবাজ প্রশাসন রাষ্ট্রকে এক সময়ের জন্য সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি জাতিকে দুর্বল করে, গণতন্ত্রকে ফাঁপা করে তোলে।

 

রাজনীতির স্বার্থে নয়, রাষ্ট্রের স্বার্থে— এখনই প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও জনমুখী প্রশাসন গড়ে তোলা। যেদিন আমলাতন্ত্র দলীয় রঙে রাঙানো থাকবে না, সেদিনই রাষ্ট্রযন্ত্র সত্যিকার অর্থে জনগণের হাতে ফিরে আসবে।

 

 

শরিফুল খান প্লাবন 

সাংবাদিক ও কলাম লেখক 

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator