চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের আশঙ্কায় আগেভাগেই বড় পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সামরিক শক্তি আরও মজবুত করতে দেশটি ১২টি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের উৎপাদন দ্বিগুণ থেকে চারগুণ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির গতি বাড়াতে পেন্টাগনের নেতৃত্বে জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা ও শীর্ষ প্রতিরক্ষা কোম্পানির প্রতিনিধিদের মধ্যে ধারাবাহিক বৈঠক চলছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে সংঘাতের সম্ভাবনা মাথায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা অস্ত্রভাণ্ডারের ঘাটতি পেন্টাগনের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই কারণেই এখন সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন অস্ত্রগুলো দ্রুত উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছরের জুন মাসে পেন্টাগনের সদর দপ্তরে এক গোলটেবিল বৈঠকে শীর্ষ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহকারীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। বৈঠকে আন্দুরিল ইন্ডাস্ট্রিজসহ নতুন বাজারে প্রবেশকারী প্রতিষ্ঠান এবং রকেট প্রোপেলান্ট সরবরাহকারীরাও অংশ নেন।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং যুদ্ধমন্ত্রী হেগসেথ আমাদের সামরিক শক্তি আরও বৃদ্ধি করতে এবং যুদ্ধাস্ত্র উৎপাদনের গতি ত্বরান্বিত করতে নানাবিধ উপায় খুঁজছেন। এই প্রচেষ্টা প্রতিরক্ষা শিল্পের নেতা এবং পেন্টাগনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যৌথ সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”
তবে এই উদ্যোগ নিয়ে সরকারের ভেতরে এবং বাইরে কিছু উদ্বেগও দেখা দিয়েছে। কারণ ক্ষেপণাস্ত্র সম্পূর্ণরূপে একত্রিত হতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে। এছাড়া নতুন সরবরাহকারীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অস্ত্রগুলো মার্কিন বাহিনীর ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য কি না, সেটি যাচাই করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
অস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে অর্থায়ন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের গত জুলাইয়ে সই করা ‘বিগ বিউটিফুল বিল’-এ পাঁচ বছরের জন্য অতিরিক্ত ২৫ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র তহবিল বরাদ্দ করা হয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, পেন্টাগনের আরও কয়েক বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত খরচ করতে হতে পারে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনে রাশিয়ার তীব্র হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষায় প্যাট্রিয়টসহ ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টরগুলোর ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। এর ফলে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের অর্ডার পূরণে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ঘাঁটি ও মিত্রদের নিরাপত্তার জন্যও মার্কিন কর্মকর্তারা এসব ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র আরও বেশি ব্যবহারের পক্ষে।
জুনের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন আরও আক্রমণাত্মক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। এরপর ইসরায়েল ও ইরানের ১২ দিনের সংঘর্ষে শত শত উন্নতমানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার আরও কমে যায়।
চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পেন্টাগন যেসব অস্ত্রের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর, লং রেঞ্জ অ্যান্টি-শিপ মিসাইল, স্ট্যান্ডার্ড মিসাইল-৬, প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল এবং জয়েন্ট এয়ার-সারফেস স্ট্যান্ডঅফ মিসাইল। এর মধ্যে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষের সম্ভাবনা যতই দূরের মনে হোক না কেন, যুক্তরাষ্ট্র এই মুহূর্তে তার সামরিক প্রস্তুতিকে এক ধাপ এগিয়ে নিতে চাচ্ছে। আর ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর এই উদ্যোগ সেই কৌশলেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ।