অন্তর্বর্তীকালীন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ২৪০০ কোটি টাকার প্রকল্পের নামে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অন্তর্বর্তীকালীন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ২৪০০ কোটি টাকার প্রকল্পের নামে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ..

আই নিউজ বিডি ডেস্ক avatar   
আই নিউজ বিডি ডেস্ক
অন্তর্বর্তীকালীন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ২৪০০ কোটি টাকার প্রকল্পের নামে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ..
অন্তর্বর্তীকালীন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ২৪০০ কোটি টাকার প্রকল্পের নামে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ..
ছবি: সংগৃহীত
স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের নিজ জেলা কুমিল্লা এবং তার উপজেলা মুরাদনগর ও এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহর উপজেলা দেবীদ্বারে ২৪০০ কোটি টাকার একটি বিশাল প্রকল্প নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।..

এতে অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া সাবেক সরকারের বিরুদ্ধে যখন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছিল, ঠিক তখনই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টার বিরুদ্ধেও প্রায় একই ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ (সজীব ভূঁইয়া) তার নিজ জেলা কুমিল্লার সড়ক ও গ্রামীণ অবকাঠামো মেরামত ও উন্নয়নের জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) মাধ্যমে ২৪০০ কোটি টাকার একটি বিশাল প্রকল্প গ্রহণ করছেন। এই প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থই তার নিজের উপজেলা মুরাদনগরে বরাদ্দ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে, যা দেশের অন্যান্য পিছিয়ে পড়া এবং অবকাঠামো বঞ্চিত জেলাগুলোর অধিকারকে খর্ব করছে।

প্রথম আলো এবং গ্লোবাল টিভি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এলজিইডি-র ইতিহাসে এককভাবে কোনো জেলার জন্য এত বড় প্রকল্প অতীতে গ্রহণ করা হয়নি। বিশেষ করে, আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরে ৪১৩ কোটি টাকা এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহর উপজেলা দেবীদ্বারে ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশিদের নিজ জেলা সাতক্ষীরাতেও, যেখানে ২১৬৮ কোটি টাকার আরেকটি বিশাল প্রকল্প নেওয়া হয়েছে এবং এই প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনিই মূল ভূমিকা রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা ও সাতক্ষীরার জন্য এমন বিশেষ প্রকল্প নেওয়া হলেও, কুড়িগ্রামের মতো অনেক জেলা রয়েছে যেখানে এলজিইডি-র হিসাব অনুযায়ী ৭০ শতাংশ উপজেলা সড়কই জরাজীর্ণ এবং ব্যবহার অনুপযোগী। কিন্তু সেই জেলার জন্য কোনো একক প্রকল্প নেওয়া হয়নি। কুড়িগ্রাম এলজিইডি সূত্রে জানানো হয়েছে, বিগত অর্থবছরে রাস্তাঘাট মেরামতের জন্য তাদের ৮০ কোটি টাকার চাহিদা থাকলেও, তারা পেয়েছিলেন মাত্র ৪০ কোটি টাকা। এছাড়াও, নোয়াখালীর ৮০ শতাংশ, চুয়াডাঙ্গার ৭৭ শতাংশ এবং খুলনার ৬০ শতাংশ সড়কও খারাপ। অথচ কুমিল্লা ও সাতক্ষীরায় যথাক্রমে ৬৫ ও ৫৫ শতাংশ সড়ক খারাপ থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রতি বিশেষ আনুকূল্য দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ, যেখানে প্রকৃত চাহিদা রয়েছে, সেখানে অর্থ বরাদ্দ করা হয়নি, বরং উপদেষ্টাদের নিজ জেলার প্রতি পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করা হয়েছে।

আসন্ন ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসিফ মাহমুদ অংশগ্রহণ করবেন বলে জানা গেছে। এই নির্বাচনের আগেই তিনি উপদেষ্টা পদ ছাড়বেন। কুমিল্লায় বিএনপির নেতারা অভিযোগ করছেন, সরকারের টাকায় উন্নয়ন কাজ করে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ নিজের নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। মুরাদনগর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কামালউদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, “উপদেষ্টা বরাদ্দ দিচ্ছেন সরকারের টাকা, আর এলাকায় প্রচার করছেন নিজের নামে।” বিভিন্ন রাস্তাঘাট বা স্থাপনা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপদেষ্টার চাচাতো ভাই এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুরাদনগর উপজেলার আহ্বায়ক ওবায়দুল সিদ্দিকীকে রাখা হচ্ছে। ওবায়দুল এলাকাবাসীর উদ্দেশ্যে বলছেন, “উপদেষ্টা আপনাদের উপহার দিয়েছে, আপনারা আগামী দিনে উপদেষ্টার দিকে খেয়াল রাখবেন।” ওবায়দুল সিদ্দিকী অবশ্য দাবি করেছেন, তারা কোথাও বলেননি যে আসিফ মাহমুদ ব্যক্তিগতভাবে এই উন্নয়ন করে দিয়েছেন, তারা সব জায়গায় বলছেন এটি বর্তমান সরকারের উন্নয়ন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশিদও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জবাবে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, তার বাড়ি সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে। তিনি বলেন, সাতক্ষীরায় বিগত ৫২ বছরে বড় কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি এবং এই জেলার প্রতি বিগত সরকারের নেতিবাচক মনোভাব ছিল। এ জেলার মানুষ রাস্তাঘাটে যাতায়াতে কষ্ট পেয়েছে, সেজন্যই এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। তবে প্রকল্পের ব্যয় যে এত বেশি, তা তিনি জানতেন না।

এই ঘটনা শুধুমাত্র অর্থ বরাদ্দে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগই নয়, বরং এটি স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারি অর্থের নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহারের মতো বিষয়গুলোকেও সামনে নিয়ে এসেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের কাছ থেকে এমন আচরণ সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। বর্তমানে কুমিল্লার প্রকল্পটির ব্যয় কমিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় আবার পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে এবং সাতক্ষীরার প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশন ফেরত পাঠানোর পর মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগ দেশের রাজনীতিতে এক গভীর হতাশার জন্ম দিয়েছে। যেখানে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি দুর্নীতিমুক্ত এবং জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিল জনগণ, সেখানে খোদ উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধেই ক্ষমতার অপব্যবহার এবং স্বজনপ্রীতির অভিযোগ সেই স্বপ্নকে ম্লান করে দিচ্ছে। এই অভিযোগের যদি সুষ্ঠু তদন্ত না হয় এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করা না হয়, তবে তা জনগণের আস্থা এবং নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাসকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator