গাজীপুরের সফিপুরে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সংস্কার ও রূপান্তরের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় গত দুই বছরের বিভিন্ন সংস্কার, উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন কার্যক্রম তুলে ধরেছেন বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ।
বুধবার (১৩ আগস্ট) আনসার-ভিডিপি একাডেমি, সফিপুরে আয়োজিত এ সভায় বাহিনীর মহাপরিচালক বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জনগণের প্রত্যাশা ও চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে আনসার-ভিডিপিকে আরও আধুনিক, দক্ষ, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বাহিনীর প্রায় ৬০ লাখ সদস্যের তথ্য বর্তমানে সুনির্দিষ্টভাবে ডাটাবেজভুক্ত করা হয়েছে। গ্রাম, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও প্লাটুন পর্যায়ের সদস্যদের তথ্যকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হয়েছে। প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে বাহিনীর সব সদস্যকে ডাটাবেজভুক্ত করার মাধ্যমে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
মহাপরিচালক জানান, বাহিনীর ডিজিটাল রূপান্তরও দৃশ্যমান হচ্ছে। নিরাপত্তা দায়িত্বে সদস্য মোতায়েন, সদস্যদের তথ্য সংরক্ষণ, বেতন-ভাতা ব্যবস্থাপনা ও দাপ্তরিক কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি আনসার-ভিডিপি জব পোর্টালের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রায় ৬০ লাখ সদস্যকে নিয়ে বিদ্যমান ERP ব্যবস্থার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সমন্বিত LLM চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ব্যবস্থায় স্বেচ্ছাসেবী সদস্যদের রক্তের প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণসহ বৃহৎ পরিসরের ব্লাড ব্যাংক সার্ভিস চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। একই সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ে মিটরিং সিস্টেম ও ডাটা সার্ভিস ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রশিক্ষণে ব্যাপক পরিবর্তন
প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সংস্কারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সাড়ে চার লাখের বেশি নতুন তরুণ সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এ প্রশিক্ষণ শুধু নির্বাচন বা উৎসবকেন্দ্রিক দায়িত্ব পালনের জন্য নয়; যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি কিংবা যেকোনো জরুরি অবস্থায় প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী জনবল যাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সে লক্ষ্যেও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।
গত দুই বছরে প্রশিক্ষণের লক্ষ্য, ধরন ও সিলেবাসে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সতেজকরণ প্রশিক্ষণ জোরদার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অঙ্গীভূত আনসারদের সেবার মান উন্নয়নে সংস্কার
বাহিনীর নিরাপত্তা দায়িত্ব প্রসঙ্গে মহাপরিচালক বলেন, অঙ্গীভূত আনসার সদস্যদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও কেপিআই স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ দায়িত্ব পালনে সদস্যদের সেবার মানসিকতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হয়েছে।
দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে বিবেচিত চাকরির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ‘রেস্ট’ প্রথা বাতিলের প্রয়োজনীয় সংস্কার, ব্যবস্থাপনা ও জনবল সমন্বয়ের কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের বেতন, রেশন ও অন্যান্য প্রাপ্যতা যথাসময়ে নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চাকরি শেষে অঙ্গীভূত আনসার সদস্যদের অবসরকালীন গ্র্যাচুইটি ফান্ড প্রাপ্তির প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
দুর্যোগ ও যুদ্ধকালীন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব
মহাপরিচালক বলেন, ব্যাটালিয়ন আনসার সদস্যদের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দুর্যোগ ও যুদ্ধকালীন ভূমিকা পালনে পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে ভিডিপি ও টিডিপি সদস্যরা তৃণমূল পর্যায়ে আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ, বৃক্ষরোপণ, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, অগ্নিনির্বাপণ, কৃষিকাজে সহায়তা, স্বেচ্ছাশ্রম এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে তারা অবদান রাখছেন।
তিনি আরও বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ের ভিডিপি ক্লাবগুলোকে ‘সঞ্জীবন’ কর্মসূচির আওতায় পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তরুণদের সম্পৃক্ত করে সামাজিক সচেতনতা, স্বেচ্ছাশ্রম ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বনির্ভর সমাজ গঠনে ভিডিপি-টিডিপি সদস্যদের ভূমিকা আরও বিস্তৃত করা হচ্ছে।
নিয়োগে স্বচ্ছতার ওপর জোর
সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার কথা উল্লেখ করে মহাপরিচালক বলেন, বর্তমানে কঠিন ও প্রতিযোগিতামূলক ধাপ অতিক্রম করেই যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীরা চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হচ্ছেন।
নিয়োগে কোনো ধরনের অবৈধ আচরণ, দুর্নীতি বা দালালির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এর ফলে দক্ষতা, জ্ঞান, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বাহিনীতে সদস্য নির্বাচনের প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হয়েছে।
অবকাঠামো ও কল্যাণ কার্যক্রমে নতুন উদ্যোগ
বাহিনীর প্রশিক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়নে একাডেমিতে বহুমুখী নতুন কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে মহাপরিচালক বলেন, উপজেলা পর্যায়ের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করা, সদর দপ্তরের ওয়েলফেয়ার শাখাকে আরও সমৃদ্ধ করা এবং মাঠপর্যায়ে সদস্যদের কল্যাণ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক কোরবানির সময়ে চামড়া সংরক্ষণে বাহিনীর বৃহৎ স্বেচ্ছাসেবী জনবলের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে নতুন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে সংস্কার কার্যক্রমের সুফল আরও দ্রুত দৃশ্যমান হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
জনবান্ধব বাহিনী গড়ার প্রত্যয়
মহাপরিচালক বলেন, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আরও জনবান্ধব, আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে সংস্কার ও রূপান্তরের ধারা অব্যাহত থাকবে।
জনগণের আস্থা ও প্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাহিনীর প্রায় ৬০ লাখ সদস্যের সক্ষমতাকে দেশের নিরাপত্তা, জনকল্যাণ ও সামাজিক উন্নয়নে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
সময়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও সাংগঠনিক সক্ষমতার আরও উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে একটি আধুনিক, দক্ষ ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন বাহিনী প্রধান।
মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বাহিনীর অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মামুনূর রশীদ, আনসার-ভিডিপি একাডেমির কমান্ড্যান্ট (ভারপ্রাপ্ত) উপমহাপরিচালক মো. সাইফুল্লাহ্ রাসেলসহ বাহিনীর অন্যান্য কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং সদস্য-সদস্যাবৃন্দ।