সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি পুনর্বিবেচনা সংক্রান্ত খসড়া প্রতিবেদনে ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক ব্যাধি (NCD) জনিত অকাল মৃত্যুহার এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে সংক্রামক ব্যাধির পাশাপাশি অসংক্রামক ব্যাধির ক্রমবর্ধমান বোঝা মোকাবেলায় নীতি-নির্ধারক থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও ব্যাপক পরিবর্তন আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। এক দশক আগেও যেখানে কলেরা, টাইফয়েড, যক্ষ্মা এবং ডায়রিয়ার মতো সংক্রামক রোগগুলো জনস্বাস্থ্যের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল, সেখানে বর্তমানে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং ক্যান্সারের মতো দীর্ঘস্থায়ী অসংক্রামক ব্যাধিগুলো নীরব ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামোর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে। এই পরিবর্তনের ঢেউ শুধু রোগ প্রতিরোধের কৌশলগত দিকই নয়, বরং স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহ, অর্থায়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যেখানে সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।
জনস্বাস্থ্যের এই পরিবর্তনের পেছনে বেশ কিছু মৌলিক কারণ বিদ্যমান। প্রথমত, বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণ, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন অসংক্রামক ব্যাধি বৃদ্ধির প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। প্রক্রিয়াজাত খাদ্য গ্রহণ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান এবং মদ্যপানের মতো অভ্যাসগুলো দেশের তরুণ এবং মধ্যবয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং স্থূলতার হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৬৭ শতাংশের জন্য অসংক্রামক ব্যাধি দায়ী, যা সংক্রামক রোগের কারণে মৃত্যুর হারকে ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ঘনবসতির কারণে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং অন্যান্য মশাবাহিত সংক্রামক রোগগুলো এখনো একটি বড় জনস্বাস্থ্য হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে। কোভিড-১৯ মহামারী প্রমাণ করেছে যে, নতুন এবং উদীয়মান সংক্রামক ব্যাধি যেকোনো সময় বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করতে পারে, যার জন্য সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি অপরিহার্য। এই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি সমন্বিত এবং সুদূরপ্রসারী কৌশল প্রণয়ন করা বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটি জটিল কিন্তু আবশ্যিক কাজ।
এই পরিবর্তনের ঢেউ স্বাস্থ্যসেবা খাতে বহুমুখী প্রভাব ফেলছে। প্রথমত, সংক্রামক রোগের জন্য তৈরি অবকাঠামো এবং জনবলকে এখন অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায়ও প্রস্তুত করতে হচ্ছে, যা প্রশিক্ষণের অভাব এবং বিশেষায়িত সরঞ্জামের ঘাটতি তৈরি করছে। উদাহরণস্বরূপ, হৃদরোগ বা ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ক্যাথ ল্যাব, রেডিওথেরাপি ইউনিট এবং প্রশিক্ষিত অনকোলজিস্টের সংখ্যা এখনো চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। দ্বিতীয়ত, অসংক্রামক ব্যাধির দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ব্যয় ব্যক্তি ও পরিবারের ওপর বিশাল আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে, যা অনেককে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্ব ব্যাংক (World Bank) এর এক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার জন্য ব্যক্তিগত ব্যয় (Out-of-pocket expenditure) মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের একটি বড় অংশ, যা প্রায় ৬৮ শতাংশ। এই উচ্চ ব্যক্তিগত ব্যয় নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিতে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অংশীদার যেমন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এবং বিশ্ব ব্যাংক বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করে আসছে, যা নীতি প্রণয়ন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই সংস্থাগুলো বর্তমানে সংক্রামক ও অসংক্রামক উভয় ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগের উপর জোর দিচ্ছে, যা দেশের স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে।
এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে, রোগ নিয়ন্ত্রণ খাতে পরিবর্তনের ঢেউ মোকাবেলা করা বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগও বটে। আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে টেলিমেডিসিন এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্মগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলেও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এবং রোগ নির্ণয় ও পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (MIS) এর আওতায় ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ আরও জোরদার করার মাধ্যমে রোগের প্রাদুর্ভাব পূর্বাভাস এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করে জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং নিয়মিত ফলো-আপের মাধ্যমে রোগের জটিলতা কমানো যেতে পারে। একই সাথে, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা এবং দ্রুত সাড়াদানকারী দল গঠন অপরিহার্য। দেশের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে, যেখানে অসংক্রামক রোগের স্ক্রিনিং এবং সংক্রামক রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে, এই পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়নে শুধুমাত্র সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, বরং বেসরকারি খাত, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এবং গণমাধ্যমের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
| রোগের ধরণ/সূচক | ২০১৫ | ২০২০ | ২০২২ | উৎস |
|---|---|---|---|---|
| মোট মৃত্যুর কারণ হিসেবে অসংক্রামক ব্যাধি (শতাংশ) | ৬১% | ৬৭% | ৬৭% | WHO Global Health Observatory |
| প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা (শতাংশ) | ২০.১% | ২৪.১% | ২৫.৫% | বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (BDHS) |
| প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ডায়াবেটিসের প্রবণতা (শতাংশ) | ৭.৮% | ১০.১% | ১১.২% | বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (BDHS) |
| যক্ষ্মা (TB) আক্রান্তের সংখ্যা (প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যায়) | ২১২ | ২০১ | ১৮৬ | জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, WHO |
| ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা (সর্বোচ্চ প্রাদুর্ভাবের বছর) | ৩,১৬২ | ১,৪০৫ | ৬২,৪৬১ | স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) |
| স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তিগত ব্যয় (Out-of-Pocket Expenditure) মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের শতাংশ | ৬৭% | ৬৮% | ৬৯% | বাংলাদেশ জাতীয় স্বাস্থ্য হিসাব (BNHA), World Bank |
উৎস: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (BDHS), জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), বাংলাদেশ জাতীয় স্বাস্থ্য হিসাব (BNHA), World Bank.
সুপারিশ
- স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত 'জাতীয় অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কৌশলপত্র ২০২৫' এর সফল বাস্তবায়নে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যায়ে অসংক্রামক ব্যাধির নিয়মিত স্ক্রিনিং, প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা এবং জীবনযাপন পরিবর্তন সংক্রান্ত কাউন্সেলিং নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং ডায়াগনস্টিক কিট ও ঔষধ সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার একটি বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ নীতি প্রণয়ন করতে পারে, যা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করে পরিচালিত হবে।
- রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা (CDC) এবং জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (IPH) এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করে দেশব্যাপী সংক্রামক ব্যাধি শনাক্তকরণ, নজরদারি এবং দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। এই প্ল্যাটফর্মকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিদ্যমান ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (MIS) এর সাথে একীভূত করে ডেটা আদান-প্রদান ও বিশ্লেষণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে হবে এবং মহামারী প্রস্তুতি ও সাড়াদান পরিকল্পনা (Pandemic Preparedness and Response Plan) নিয়মিত হালনাগাদ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
- বিশ্ব ব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এর সহযোগিতায় পরিচালিত বর্তমান স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর আওতা বৃদ্ধি করে অসংক্রামক ও সংক্রামক উভয় ব্যাধি নিয়ন্ত্রণের জন্য দীর্ঘমেয়াদী টেকসই অর্থায়ন মডেল তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে, 'স্ট্রেন্থেনিং হেলথ সিস্টেমস' (Strengthening Health Systems) এর মতো প্রকল্পগুলোতে প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা জোরদার করতে পারে এবং স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থার সম্প্রসারণে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে।