প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভায় তথ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ও ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। শুক্রবার (২১ আগস্ট) বঙ্গভবনে নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠানে তার যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। বিজেপির মহাসচিব আব্দুল মতিন সাউদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, যদিও কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব চূড়ান্তভাবে দেওয়া হচ্ছে তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়নি; সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি অনুযায়ী তাকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন মন্ত্রিসভায় তার সঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরী এবং গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকনেরও অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
আন্দালিব রহমান পার্থ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭৪ সালের ২০ এপ্রিল, তৎকালীন অবিভক্ত বরিশাল জেলার ভোলা দ্বীপের একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক পরিবারে। তার বাবা প্রয়াত নাজিউর রহমান মঞ্জুর ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, দলের মহাসচিব এবং সরকারের মন্ত্রী; তিনি ভোলা-১ আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পার্থের দুই ভাই রয়েছে, অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান শান্ত এবং ব্যারিস্টার ওয়াছিকুর রহমান অঞ্জন।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাজীবনে তিনি ঢাকার সেন্ট জোসেফ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন, ছাত্রজীবনে মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিতি ছিল তার। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি লন্ডনে যান এবং সেখান থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি নিয়ে ব্যারিস্টার হন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থী বর্তমানে ঢাকায় অবস্থিত ব্রিটিশ স্কুল অব ল-এর অধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন,অর্থাৎ রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষকতা ও আইন পেশার সঙ্গেও তিনি যুক্ত।
পারিবারিক সূত্রে তিনি বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, তার মা রেবা রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নি। ২০০০ সালের মার্চে তিনি বিয়ে করেন বঙ্গবন্ধুর ভাতিজা শেখ হেলালের মেয়ে শেখ সায়রা রহমানকে। এই সূত্রে শেখ হাসিনা তার সম্পর্কে ফুফু হন। এই দম্পতির তিন সন্তান রয়েছে। পারিবারিকভাবে ক্ষমতাসীন পরিবারের সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের একজন সোচ্চার সমালোচক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন, যা তাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ব্যতিক্রমী ও আলোচিত অবস্থানে রেখেছে।
২০০০ সালে ২৬ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে পার্থ রাজনীতিতে হাতেখড়ি নেন। ২০০৮ সালের এপ্রিলে বাবার মৃত্যুর পর মাত্র ৩৪ বছর বয়সে তিনি দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন,তখন দেশে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনকাল, রাজনীতিকদের জন্য একটি কঠিন সময় হিসেবে বিবেচিত।
একই বছর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে ভোলা-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুনকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি সংস্থাপন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে তার দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তের কারণে তিনি সেবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি।
গত দেড় যুগ ধরে আন্দালিব রহমান পার্থ তার তীক্ষ্ণ বাগ্মিতা ও সরাসরি সমালোচনার জন্য পরিচিতি পেয়েছেন, বিশেষত আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কর্মকাণ্ডের কড়া সমালোচক হিসেবে। পারিবারিক সূত্রে শেখ পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রকাশ্যে সমালোচনা থেকে বিরত থাকেননি বলে গণমাধ্যমে বহুবার আলোচিত হয়েছে। এই অবস্থানের কারণে তিনি তরুণ রাজনীতিসচেতন অংশের একাংশের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন এবং তার বাগ্মিতা ও তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সক্ষমতা প্রায়ই আলোচিত হয়। একসময় বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোটের অভ্যন্তরে তাকে বেগম খালেদা জিয়া-পরবর্তী সম্ভাব্য জোট নেতৃত্বের অন্যতম যোগ্য মুখ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছিল কোনো কোনো মহল থেকে।
তবে তার এই ভাবমূর্তি সর্বজনস্বীকৃত নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন আলোচনায় একটি অংশ তার রাজনৈতিক অবস্থানকে সুবিধাবাদী বলে সমালোচনা করে থাকে, বিশেষত ক্ষমতাসীন পরিবারের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক এবং একই সঙ্গে সরকারবিরোধী অবস্থান নেওয়ার দ্বৈততাকে কেন্দ্র করে। কেউ কেউ তার ব্যারিস্টারসুলভ যুক্তিতর্ক-নির্ভর বাগ্মিতাকে "কথার মারপ্যাঁচ" বলে সমালোচনা করেছেন, আবার অনেকে তাকে সৎ ও নির্ভীক রাজনীতিক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই দ্বিধাবিভক্ত মূল্যায়ন তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তির একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে "গরুর গাড়ি" প্রতীক নিয়ে ভোলা-১ (সদর) আসন থেকে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আন্দালিব রহমান পার্থ। নতুন সংসদে তিনি একজন সরব ও আলোচিত কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
সংসদের প্রথম অধিবেশনেই তিনি মন্তব্য করেন, বিগত ১৫ বছর ধরে যারা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন তাদের কেউ এই সংসদে নেই বলে উল্লেখ করে এটিকে সংসদের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য বলে অভিহিত করেন এবং সবাইকে গণতন্ত্রের পথে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। এরপর সংবিধান সংস্কার নিয়ে আলোচনায় তিনি "জুলাই জাতীয় সনদ" বাস্তবায়ন প্রশ্নে সরকারি দলের সমালোচনা করে বলেন, বিরোধী দলকে জুলাই আন্দোলনের বিপরীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। গণভোট প্রসঙ্গে সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি অভিযোগ করেন যে জনগণকে হ্যাঁ ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছিল,এই বক্তব্যের সময় সংসদে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়।
সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে (আগস্ট ২০২৬) তিনি সাবেক ক্ষমতাসীন সরকারের সমালোচনা করে মন্তব্য করেন যে, "দেশকে কীভাবে ধ্বংস করা যায়" তার নীলনকশা গণভবনে তৈরি হতো বলে তিনি অভিযোগ করেন। এছাড়া সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে তার একটি বক্তব্যের জেরে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গে তার তীব্র বাগবিতণ্ডা হয়, যা গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়। বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিন রাজনীতি করা নেতাদের সাংবিধানিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি ট্রেজারি বেঞ্চের সমালোচনাও করেছেন। এসব মন্তব্য একদিকে যেমন তাকে সংসদে একজন সরব উপস্থিতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, তেমনি বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ২৪ জুলাই দিবাগত রাতে রাজধানীর গুলশানের বাসা থেকে পার্থকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তৎকালীন ডিবিপ্রধান হারুন-উর-রশিদের বরাতে জানা যায়, কোটা সংস্কার আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া বনানীর সেতু ভবনে হামলা ও ভাঙচুরের মামলাতেও তাকে আসামি করা হয়, যে মামলায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছিল। ২৫ ও ৩০ জুলাই পরপর দুই দফায় রিমান্ড শেষে ২ আগস্ট তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে জামিন আবেদনের শুনানি শেষে আদালত তার জামিন মঞ্জুর করলে তিনি কারামুক্ত হন।
এই গ্রেপ্তার ও কারাবরণের ঘটনা তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল,সমর্থকরা একে রাজনৈতিক হয়রানি হিসেবে অভিহিত করলেও, তৎকালীন প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট ফৌজদারি অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়। ঘটনার প্রকৃত প্রেক্ষাপট নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।
গ্রেপ্তারের কিছুদিন পর, ২০২৫ সালের মে মাসে তার স্ত্রী শেখ সায়রা শারমিন ও কন্যা মদিনা বিনতে আন্দালিব থাইল্যান্ডে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তবে প্রথমবার বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স না পাওয়ায় তাদের বাসায় ফিরে যেতে হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল,এই ঘটনাও পরিবারটির ওপর তৎকালীন রাজনৈতিক চাপের একটি উদাহরণ হিসেবে গণমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে।
২০২৬ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে অংশ নেওয়া আন্দালিব রহমান পার্থ এখন নতুন মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন। দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের রাজনৈতিক জীবনে বিরোধী দলের কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত হওয়া থেকে শুরু করে গ্রেপ্তার-কারাবরণের অভিজ্ঞতা পেরিয়ে সরকারের অংশ হিসেবে মন্ত্রিত্বে অন্তর্ভুক্তি তার রাজনৈতিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শপথ অনুষ্ঠানের পর তার দায়িত্ব ও মন্ত্রণালয় বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার কথা রয়েছে।
আন্দালিব রহমান পার্থের রাজনৈতিক জীবনরেখা টেনে দেখলে দেখা যায়,বাবার হাত ধরে অল্প বয়সে রাজনীতিতে প্রবেশ, বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর অল্প বয়সেই দলের নেতৃত্বভার গ্রহণ, ২০০৮ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া, দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থান, ২০২৪ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার ও কারাবরণ, এবং সবশেষে ২০২৬ সালের নির্বাচনে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে এখন মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি,এই সবকিছু মিলিয়ে তার রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের গত দুই দশকের উত্থান-পতনময় রাজনীতির একটি প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
একইসঙ্গে এটাও লক্ষণীয় যে তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি সর্বসম্মত নয়। একদিকে তিনি তরুণ প্রজন্মের একাংশের কাছে সৎ ও নির্ভীক কণ্ঠস্বর হিসেবে সমাদৃত, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন পরিবারের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক অবস্থানের দ্বৈততা নিয়ে সমালোচনার মুখেও পড়েছেন তিনি বারবার। সংসদে তার আক্রমণাত্মক ও তীক্ষ্ণ বক্তব্যশৈলী যেমন তাকে আলোচনায় রাখে, তেমনি তা কখনো কখনো অন্য সংসদ সদস্যদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাগবিতণ্ডারও জন্ম দিয়েছে। তথ্যমন্ত্রীর মতো স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর তার এই বাগ্মিতা ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কীভাবে কাজে লাগে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।